ভূমিকা: নারীরা কেন রাজনীতিতে পিছিয়ে?
আজকের বিশ্বে নারীরা বিজ্ঞান থেকে ব্যবসা, শিক্ষা থেকে খেলাধুলা—সব ক্ষেত্রে নিজেদের প্রমাণ করছেন। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে তাদের উপস্থিতি এখনও অনেক দেশে দুর্বল। ত্রিশ বছর আগে, ১৯৯৫ সালে, বিশ্বের আইনসভায় নারী সদস্য ছিলেন মাত্র ১১.৩ শতাংশ। এখন, ২০২৫ সালে, সেটা বেড়ে হয়েছে ২৭.২ শতাংশ। অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি)-এর লক্ষ্য—২০৩০ সালের মধ্যে রাজনীতিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ—এখনও অনেক দূরে। কেন? কারণ সাধারণ নির্বাচনে নারীরা সামাজিক কুসংস্কার, অর্থনৈতিক অসুবিধা আর পুরুষ-প্রধান সমাজের বাধার মুখে পড়েন।
এই বাধা কাটাতে অনেক দেশে চালু হয়েছে সংরক্ষিত নারী আসন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আইনসভার নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন শুধু নারীদের জন্য রাখা হয়। এই আসনগুলো সংবিধান বা আইন দিয়ে নির্ধারিত হয়, আর নির্বাচন হয় তিনভাবে: সরাসরি ভোটে, পার্টির মনোনয়ন দিয়ে, বা পরোক্ষভাবে। আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিসট্যান্স (আইডিয়া) বলছে, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশে এমন কোনো না কোনো জেন্ডার কোটা আছে। উদাহরণ হিসেবে রওয়ান্ডা আর কিউবার কথা বলা যায়, যেখানে নারী সদস্য ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এই লেখায় আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের গল্প তুলে ধরব। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উদাহরণ দেখব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব দেব, কারণ এখানে ১৯৭২ সাল থেকে এই ব্যবস্থা নারী ক্ষমতায়নের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোকে এর ভবিষ্যৎও আলোচনা করব।
ঐতিহাসিক পটভূমি: কীভাবে শুরু হলো?
নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ধারণা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু। ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চীনের মতো দেশে পার্টি-ভিত্তিক কোটা চালু হয়। ১৯৯০-এর দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলো এটি গ্রহণ করে, বিশেষ করে জাতিসংঘের বেইজিং ডিক্লারেশন (১৯৯৫)-এর পর, যখন ১৩০টির বেশি দেশ কোটা ব্যবস্থা চালু করে। এটি ছিল নারীদের জন্য রাজনৈতিক দরজা খোলার একটি বিপ্লব।
আফ্রিকায় এটি শুরু হয় উপনিবেশ-পরবর্তী সংস্কারের মাধ্যমে। উগান্ডা ১৯৮৯ সালে প্রথম এই পথে হাঁটে। এশিয়ায় বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পরই সংবিধানে ১৫টি সংরক্ষিত আসন যুক্ত করে। লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ১৯৯১ সালে ক্যান্ডিডেট কোটা শুরু করে। ইউরোপে নরওয়ে-সুইডেন পার্টি-ভিত্তিক কোটা নিয়ে আসে, আর ফ্রান্স ২০০০ সালে আইন করে। উত্তর আমেরিকায় কোটা কম, তবে কানাডায় পার্টি-উদ্যোগ আছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ‘ক্রিটিক্যাল মাস’—অর্থাৎ ৩০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব, যা নারী-বান্ধব নীতি তৈরিতে সাহায্য করে। গবেষণা বলছে, কোটা থাকলে নারী প্রতিনিধিত্ব ৭-১০ শতাংশ বাড়ে। তবে সমস্যাও আছে—পার্টির নিয়ন্ত্রণে নারীরা কখনো ‘টোকেন’ বা প্রতীকী হয়ে যান। তবু, এটি একটি শক্তিশালী শুরু। (শব্দ: ৩২০)
বাংলাদেশ: সংরক্ষিত আসনের যাত্রা
বাংলাদেশে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের শুরুটা হয় ১৯৭২ সালে, স্বাধীনতার পর প্রথম সংবিধানে (আর্টিকেল ৬৫)। তখন ১৫টি আসন সংরক্ষিত করা হয়, ১০ বছরের জন্য। সাধারণ সংসদ সদস্যরা পরোক্ষভাবে ভোট দিয়ে এই নারী সদস্যদের বেছে নিতেন। ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীতে আসন বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়, মেয়াদ ১৫ বছর। ১৯৮৮ সালে মেয়াদ শেষ হলে ১৯৯০-এ পুনরায় চালু হয়, কিন্তু ২০০১-এ আবার বন্ধ হয়। ২০০৪ সালে ১৪তম সংশোধনীতে আসন ৪৫টি করা হয়, এবং ২০১১-এ ১৫তম সংশোধনীতে ৫০টি (মোট ৩৫০ আসনের ১৪.৩ শতাংশ), মেয়াদ ২৫ বছর (২০৩০ পর্যন্ত)।
বর্তমানে (২০২৫ সাল), জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন আছে। এছাড়া, সাধারণ আসন থেকে ২০-২৫ জন নারী নির্বাচিত হন, ফলে মোট নারী প্রতিনিধিত্ব ২০.৮৬ শতাংশ। নির্বাচন পদ্ধতি পরোক্ষ—সাধারণ সদস্যরা ভোট দেন, যা পার্টিগুলোর আসন অনুযায়ী বণ্টিত হয়। এটি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ালেও, সমালোচকরা বলেন, এটি পার্টি-নিয়ন্ত্রিত হয়ে ‘প্রতীকী’ হয়ে যায়।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে পর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দ্বিকক্ষীয় সংসদের প্রস্তাব দিয়েছে: নিম্নকক্ষে ৩৫০ আসন (৫০টি সংরক্ষিত), উচ্চকক্ষে ১০০ আসন (প্রপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশন-ভিত্তিক)। নারী অধিকার সংগঠনগুলো ১৫০টি সরাসরি নির্বাচিত সংরক্ষিত আসনের দাবি জানাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আফ্রিকা: নারীরা যেখানে এগিয়ে
আফ্রিকা সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। এখানে নারী প্রতিনিধিত্বের গড় ২৭ শতাংশ। রওয়ান্ডা বিশ্বের শীর্ষে। ২০০৩ সালে তাদের সংবিধানে ৩০ শতাংশ কোটা চালু হয়। নিম্নকক্ষে ৮০ আসনের মধ্যে ২৪টি সংরক্ষিত, নির্বাচিত হয় স্থানীয় সভার ভোটে। ফলে, ২০২৫ সালে নারী সদস্য ৬৩.৭৫ শতাংশ, বিশ্বের সর্বোচ্চ। জেনোসাইডের পর নারীরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর নীতি প্রণয়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন।
উগান্ডায় ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি জেলায় একটি আসন সংরক্ষিত, সরাসরি নির্বাচিত। এতে নারী ৩৫ শতাংশ। তানজানিয়ায় ৩৯৩ আসনের ১১৩টি (২৮ শতাংশ) সংরক্ষিত, পার্টি মনোনয়ন দিয়ে। কেনিয়ায় ৩৪৯ আসনের ৪৭টি (১৩ শতাংশ) সংরক্ষিত, কাউন্টি-ভিত্তিক সরাসরি নির্বাচন। এই ব্যবস্থা গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা আর স্বাস্থ্য নীতিতে নারীদের ভূমিকা বাড়িয়েছে। তবে পার্টি-প্রভাব এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। (শব্দ: ২৬০)
এশিয়া: সাংস্কৃতিক বাধার সঙ্গে লড়াই
এশিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্ব ২২ শতাংশ, যা বিশ্বের তুলনায় কম। পাকিস্তানে ৩৪২ আসনের ৬০টি (১৮ শতাংশ) সংরক্ষিত, প্রাদেশিক মনোনয়ন দিয়ে। নারী ১৭ শতাংশ। ভারতে ২০২৩ সালে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের বিল পাস হয়েছে, সরাসরি নির্বাচিত, তবে ২০২৬-এর পর বাস্তবায়ন হবে। বর্তমানে নারী ১৫ শতাংশ। নেপালে ২৭৫ আসনের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত, মিশ্র পদ্ধতিতে, নারী ৩৩ শতাংশ। এই ব্যবস্থা শিক্ষা আর স্বাস্থ্য খাতে নারীদের ভূমিকা বাড়াচ্ছে, তবে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বাধা এখনও রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য: ধীরে ধীরে এগোচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যে নারী প্রতিনিধিত্ব ১৯ শতাংশ। জর্ডানে ১৩০ আসনের ১৫টি (১২ শতাংশ) সংরক্ষিত, পার্টি তালিকায় সরাসরি নির্বাচিত। মরক্কোয় ৩৯৫ আসনের ৯০টি (২৩ শতাংশ) সংরক্ষিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ৫০ শতাংশ নারী। এটি দেখায়, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। (শব্দ: ১৬০)
লাতিন এবং দক্ষিণ আমেরিকা: বিশ্বের শীর্ষে
এই অঞ্চলে নারী প্রতিনিধিত্ব ৩৫.৪ শতাংশ, বিশ্বের সর্বোচ্চ। মেক্সিকোয় ৫০০ আসনের ৫০ শতাংশ ক্যান্ডিডেট কোটা, নারী ৫০ শতাংশ। আর্জেন্টিনায় ৫০ শতাংশ কোটা, বলিভিয়ায় ৪৬ শতাংশ, কোস্টা রিকায় ৪৭ শতাংশ, নিকারাগুয়ায় ৫২ শতাংশ। এই কোটা দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা আর স্বাস্থ্য নীতিতে নারীদের ভূমিকা বাড়িয়েছে।
ইউরোপ: স্বেচ্ছায় এবং আইনের মিশ্রণ
ইউরোপে নারী প্রতিনিধিত্ব ৩১.৭ শতাংশ। ফ্রান্সে ৫০ শতাংশ ক্যান্ডিডেট কোটা, নারী ৩৯ শতাংশ। সুইডেনে পার্টি কোটা, ৪৬ শতাংশ। স্পেনে ৪০ শতাংশ, ৪৪ শতাংশ। বেলজিয়ামে ৫০ শতাংশ। এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের লিঙ্গ সমতা নীতির ফল।
উত্তর আমেরিকা: কোটা ছাড়াই এগিয়ে
উত্তর আমেরিকায় কোটা নেই, তবু নারী ৩০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ শতাংশ, কানাডায় ৩০ শতাংশ। সামাজিক আন্দোলন আর পার্টি-উদ্যোগ এটি সম্ভব করেছে।
সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ: দুই দিকের গল্প
গবেষণায় দেখা গেছে যে, রাজনীতিতে নারীদের সংখ্যা বাড়লে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
২০২১ সালের কোলোরাডো বোলডার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দেখা গেছে, সংসদে নারীরা প্রভাবশালী হলে সাধারণত দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ে।
একইভাবে ২০২০ সালের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের দেশগুলোর সংসদে নারীদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার কারটিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সুপারিশ করেছিলেন, যেসব সংসদে নারীর সংখ্যা বেশি, সেসব সংসদ শক্তিশালী জলবায়ু নীতিমালা তৈরি কতে পারে।
তবে সিএফআর’র উইমেন্স পাওয়ার ইনডেক্সের জেমস সতর্ক করে বলেন যে, নারীদের নির্বাচিত করাই এই ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় না।
তার যুক্তিতে, নারীরা কোনো সমজাতীয় গোষ্ঠী না– ফলে সবাই লিঙ্গ সমতা, শান্তি বা সহযোগিতার পক্ষে সমর্থন করবে না।
সংরক্ষিত আসন নারীদের রাজনৈতিক দরজা খোলে। রওয়ান্ডায় এটি জেন্ডার ভায়োলেন্স আইন তৈরি করেছে। গবেষণা বলছে, কোটা স্বাস্থ্য বাজেট ১০ শতাংশ বাড়ায়। কিন্তু সমস্যা আছে: নারীরা কখনো পার্টির নিয়ন্ত্রণে ‘টোকেন’ হয়ে যান। ২১টি দেশে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০ শতাংশের নিচে। তাই কোটার পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচন, অর্থায়ন আর সামাজিক সচেতনতা দরকার।
ভবিষ্যৎ: আশার আলো
কোটা নারী প্রতিনিধিত্ব ১৫ শতাংশ বাড়ায়। জাতিসংঘ বলছে, ২০৬৩ সালে লিঙ্গ সমতা সম্ভব। বাংলাদেশে দ্বিকক্ষীয় সংসদ আর সরাসরি নির্বাচিত আসনের প্রস্তাব নারীদের আরও শক্তিশালী করতে পারে।
উপসংহার: বাংলাদেশের জন্য পাঠ
সংরক্ষিত নারী আসন বিশ্বজুড়ে নারীদের কণ্ঠ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে এই যাত্রা শুরু, এবং ২০২৫-এর রিফর্ম এটিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। নারীরা এগোলে দেশ এগোয়।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পদ্ধতি
আইনসভায় সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন হয়, তবে এগুলো মূলত সংবিধান বা আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। নিচে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত প্রধান নির্বাচন পদ্ধতিগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো, যেগুলোর মাধ্যমে নারীদের মনোনয়ন বা নির্বাচন করে আইনসভার সদস্য করা হয়। এই তথ্যগুলো আইডিয়া (ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিসট্যান্স), ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ), এবং সাম্প্রতিক উৎস (২০২৫ সাল পর্যন্ত) থেকে যাচাই করা।
আইনসভার সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পদ্ধতির তালিকা
- সরাসরি নির্বাচন (Direct Election) : নারীরা সংরক্ষিত আসনের জন্য সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। এই আসনগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জেলার জন্য নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এই পদ্ধর্তি নারীদের জনগণের সাথে সরাসরি সংযোগ দেয়, কিন্তু প্রচারণার জন্য অর্থ ও সমর্থনের প্রয়োজন হয়।
- উদাহরণ:
- উগান্ডা: প্রতি জেলায় একটি সংরক্ষিত নারী আসন, যেখানে শুধু নারী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জনগণ ভোট দেয়।
- কেনিয়া: ৪৭টি কাউন্টি-ভিত্তিক সংরক্ষিত আসন, নারীরা সরাসরি নির্বাচিত।
- পরোক্ষ নির্বাচন (Indirect Election): সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের সাধারণ সংসদ সদস্যরা বা অন্য কোনো নির্বাচিত সভা ভোট দিয়ে নির্বাচন করে। এটি পার্টি-নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, ফলে নারীরা কখনো ‘টোকেন’ হয়ে যান। তবে এটি নারীদের রাজনৈতিক প্রবেশ সহজ করে।
- উদাহরণ:
- বাংলাদেশ: ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের সাধারণ ৩০০ সংসদ সদস্য ভোট দিয়ে নির্বাচন করেন। পার্টিগুলোর আসনের প্রপোর্শন অনুযায়ী এটি বণ্টিত হয়।
- রওয়ান্ডা: ৮০ আসনের মধ্যে ২৪টি সংরক্ষিত নারী আসন, যা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হয়।
- উদাহরণ:
- পার্টি মনোনয়ন (Party Nomination/Appointment): রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী তালিকা থেকে নারীদের মনোনয়ন দিয়ে সংরক্ষিত আসনে নিয়োগ করে। এটি সাধারণত প্রপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) সিস্টেমে হয়। এই পদ্ধর্তিতে নারী প্রতিনিধিত্ব দ্রুত বাড়ায়, কিন্তু পার্টির প্রভাব বেশি থাকে, আর নারীরা জনগণের সাথে সরাসরি সংযুক্ত নাও হতে পারেন।
- উদাহরণ:
- তানজানিয়া: ৩৯৩ আসনের মধ্যে ১১৩টি সংরক্ষিত, যা পার্টিগুলো তাদের জাতীয় তালিকা থেকে মনোনয়ন দেয়।
- পাকিস্তান: ৩৪২ আসনের ৬০টি সংরক্ষিত, পার্টিগুলো প্রাদেশিক তালিকা থেকে নারীদের মনোনয়ন দেয়।
- প্রপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশন (Proportional Representation – PR) তালিকায় কোটা: পার্টিগুলোর নির্বাচনী তালিকায় নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। সংরক্ষিত আসনগুলো পার্টির নির্বাচিত আসনের অনুপাতে নারীদের দেওয়া হয়। এটি লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করে, কিন্তু জনগণের পরিবর্তে পার্টির পছন্দ প্রাধান্য পায়।
- উদাহরণ:
- মরক্কো: ৩৯৫ আসনের ৯০টি সংরক্ষিত, জাতীয় তালিকায় পার্টিগুলো নারীদের মনোনয়ন দেয়।
- তাইওয়ান: পার্টি-লিস্ট আসনের অর্ধেক নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
- উদাহরণ:
- ক্যান্ডিডেট কোটা (Candidate Quota): সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে, পার্টিগুলোকে নির্বাচনে নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এটি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ায়। এটি নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ দেয়, তবে পার্টিগুলো যদি কম প্রতিযোগিতামূলক আসনে নারীদের দেয়, তবে প্রভাব কমে।
- উদাহরণ:
- মেক্সিকো: ৫০ শতাংশ ক্যান্ডিডেট কোটা, ফলে নারী প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ।
- ফ্রান্স: ২০০০ সালের প্যারিটি আইনে ৫০ শতাংশ ক্যান্ডিডেট কোটা।
- আর্জেন্টিনা: ১৯৯১ সাল থেকে ৫০ শতাংশ কোটা।
- নিয়োগ বা ডিক্রি (Appointment by Decree): সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান সরাসরি নারীদের সংরক্ষিত আসনে নিয়োগ করেন। এটি সাধারণত অগণতান্ত্রিক বা আংশিক গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যায়। এটি দ্রুত নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ায়, কিন্তু গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার অভাব থাকতে পারে।
- উদাহরণ:
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ৫০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিয়োগ করা হয়।
- ভলান্টারি পার্টি কোটা (Voluntary Party Quota): কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় তাদের তালিকায় নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী রাখে। এটি সাধারণত উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যায়। এটি সামাজিক সচেতনতার ফল, তবে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় ধারাবাহিকতা নির্ভর করে পার্টির ইচ্ছার উপর।
- উদাহরণ:
- সুইডেন: পার্টিগুলো স্বেচ্ছায় ৫০ শতাংশ কোটা মেনে চলে, নারী ৪৬ শতাংশ।
- নরওয়ে: পার্টি-ভিত্তিক কোটা, নারী ৪০ শতাংশ।
- উদাহরণ:
নারীর ভোটাধিকার
ভোটের অধিকার অর্জনের পথে নারীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, সামাজিক বাধা এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হয়েছে। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুরুষদের জন্যও সার্বজনীন ভোটাধিকার বিরল ছিল। নারীদের জন্য এটি আরও দুর্লভ ছিল। ১৮৮১ সালে আইল অফ ম্যান সম্পত্তিশালী নারীদের ভোটাধিকার দেয়। ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড (তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ) বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে সকল নারীকে পূর্ণ ভোটাধিকার দেয়। এরপর ১৮৯৪ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া নারীদের ভোট দেওয়া এবং প্রার্থী হওয়ার অধিকার দেয়। ১৯০২ সালে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ গঠনের পর অন্যান্য উপনিবেশেও এই অধিকার প্রসারিত হয়।
ইউরোপে ফিনল্যান্ড (তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্যের অংশ) ১৯০৬ সালে নারীদের ভোটাধিকার দেয়, এবং ১৯০৭ সালে প্রথম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নরওয়ে ১৯১৩ সালে এই অধিকার দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নারীদের অবদান জনমত বদলায়, ফলে কানাডা (১৯১৭), যুক্তরাজ্য (১৯১৮), এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯২০) নারীদের ভোটাধিকার দেয়। তবে, স্পেন (১৯৩১), ফ্রান্স (১৯৪৪), ইতালি (১৯৪৬), গ্রিস (১৯৫২), এবং সুইজারল্যান্ড (১৯৭১) পরে এই অধিকার দেয়। লাতিন আমেরিকায় ১৯৪০-এর দশকে অধিকাংশ দেশ, এবং প্যারাগুয়ে সর্বশেষ ১৯৬১ সালে নারীদের ভোটাধিকার দেয়।
এশিয়ায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলো রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) পর নারীদের ভোটাধিকার পায়। মঙ্গোলিয়া ১৯২৪ সালে, থাইল্যান্ড ১৯৩২ সালে (স্থানীয় নির্বাচনে ১৮৯৭ থেকে), এবং চীন ১৯৪৭ সালে এই অধিকার দেয়। জাপান ১৯৪৫ সালে, এবং ভারত ১৯৫০ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকারের অংশ হিসেবে নারীদের ভোটাধিকার দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, লেবানন, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, এবং ইয়েমেন ১৯৫০-১৯৭০-এর দশকে ভোটাধিকার দেয়। তবে, ওমান (১৯৯৭), কাতার (১৯৯৯), বাহরাইন (২০০২), এবং সৌদি আরব (২০১৫, পৌরসভা নির্বাচন) অনেক পরে নারীদের ভোটাধিকার দেয়।
আন্দোলন এবং সংগঠন
নারীর ভোটাধিকারের জন্য বিশ্বজুড়ে সংগঠিত আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯০৪ সালে জার্মানির বার্লিনে আন্তর্জাতিক নারী ভোটাধিকার মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা নারীর সমান নাগরিক অধিকারের জন্য কাজ করে। ব্রিটেনে এমেলিন প্যাংকহার্স্ট ১৯০৩ সালে উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন (ডব্লিউএসপিইউ) প্রতিষ্ঠা করেন। এই আন্দোলনকারীরা, যাদের ‘সাফ্রেজেট’ নামে ডাকা হতো, জানালা ভাঙা, দালানে আগুন দেওয়া, এবং শিকলবন্দী হওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে এমিলি ডেভিসন ইংল্যান্ডের এপসমে ঘোড়দৌড়ে রাজার ঘোড়ার নিচে পড়ে প্রাণ হারান, যা নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে সামনে নিয়ে আসে।
অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নারীদের ভোটাধিকার বৈষম্য অনেক কমে। গ্লোবাল চেঞ্জ ডেটা ল্যাবের বাস্টিয়ান হের বলেন, যুদ্ধের আগে এক-তৃতীয়াংশ দেশে পুরুষদের এবং এক-ষষ্ঠাংশ দেশে নারীদের ভোটাধিকার ছিল। যুদ্ধের পরবর্তী দশকগুলোতে এই বৈষম্য দ্রুত হ্রাস পায়। আফ্রিকায় স্বাধীনতার পর অনেক দেশ নারীদের ভোটাধিকার দেয়, যদিও দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা ১৯৯৩ সালে প্রথম ভোট দেয়।
তবে, আইনি অধিকার থাকলেও বাস্তবে ভোট দেওয়া চ্যালেঞ্জিং। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ বলছে, মিশরের মতো দেশে নারীদের কম পরিচয়পত্র থাকে, এবং স্বামীরা প্রায়ই এটি নিয়ন্ত্রণ করেন। সামাজিক রীতি, ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, এবং সহিংসতা নারীদের ভোটাধিকার ব্যবহারে বাধা দেয়। আফগানিস্তানে তালেবান শাসন (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০২১ থেকে-বর্তমান) নারীদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন বলছে, “আফগান নারীরা ১০০ বছর আগে ভোট দেয়ার অধিকার পেয়েছিল, কিন্তু আজ তালেবান শাসনের অধীনে তাদেরকে কার্যত জনজীবন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে”।
“বর্তমানে কোনো আফগান নারী জাতীয় বা প্রাদেশিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে নেই”।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
ভোটাধিকারের পাশাপাশি নারীদের আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। ১৯০৭ সালে ফিনল্যান্ডে প্রথম নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে রওয়ান্ডা বিশ্বের প্রথম নারী-সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ গঠন করে। বর্তমানে রওয়ান্ডা (৬১%), কিউবা (৫৩%), এবং নিকারাগুয়া (৫২%) সংসদে নারী-সংখ্যাগরিষ্ঠ। মেক্সিকো, আন্দোরা, এবং ইউএই-এ ৫০% লিঙ্গ সমতা রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের উইমেন্স পাওয়ার ইনডেক্স বলছে, এই দেশগুলোর মধ্যে কিউবা ছাড়া বাকিরা কোটা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। তবে, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ইয়েমেনসহ আটটি দেশের সংসদে কোনো নারী নেই।
নারী নেতৃত্ব
১৯৪৬ সাল থেকে ৮০টি দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান ছিলেন। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কার সিরিমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তবে, বাস্টিয়ান হেরের মতে, শীর্ষ পদে নারীদের সংখ্যা এখনও কম।

Leave a Reply