নেপালের গণঅভ্যুত্থান ২০২৫

নেপাল, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই ছোট্ট দেশটি, সাম্প্রতিককালে একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই অভ্যুত্থান, যা ‘জেন জি রেভোলিউশন’ নামে পরিচিত, তরুণ – তরুণীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এটি কেবলমাত্র সরকারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, বেকারত্ব, সুযোগের অভাব এবং সামাজিক মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরক বিদ্রোহ। এই ঘটনায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, শতাধিক আহত হয়েছে, এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের মাধ্যমে এই অভ্যুত্থানের প্রথম পর্যায় শেষ হয়েছে, কিন্তু এর প্রভাব নেপালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

অতীতের ইতিহাস: রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং মাওবাদী আন্দোলন

নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়। দেশটির ইতিহাসে বারবার বিদ্রোহ এবং পরিবর্তন দেখা গেছে, যা বর্তমান অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করেছে। নেপাল রাষ্ট্রের জন্ম এবং ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকে শুরু হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে (প্যালিওলিথিক, মেসোলিথিক এবং নিওলিথিক যুগ) সিওয়ালিক পাহাড়ে মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে দ্রাবিড়, তিব্বতো-বর্মী এবং ইন্দো-আর্য জাতিগত মানুষ বাস করত। প্রাচীনকালে (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০-৩০০ সাল) কিরাত রাজবংশ দীর্ঘকাল শাসন করে, যা সম্ভবত গঙ্গা ডেল্টা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্রাট অশোকের সময় (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) লুম্বিনীতে বৌদ্ধ প্রভাব দেখা যায়, যেখানে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। মধ্যযুগে (৩০০-১৭৬৮ সাল) লিচ্ছবি রাজবংশ (৪র্থ-৮ম শতাব্দী) কাঠমান্ডু উপত্যকা শাসন করে, যা সাংস্কৃতিক এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন করে। থাকুরি রাজবংশের পর মল্ল রাজবংশ (১২শ-১৮শ শতাব্দী) কাঠমান্ডু, ভক্তপুর এবং পাটনের মতো রাজ্যে বিভক্ত হয়ে শাসন করে, যা শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত (ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট)।

আধুনিক যুগে (১৭৬৮-১৯৫১ সাল) গোর্খা রাজা প্রিথ্বী নারায়ণ শাহ ১৭৬৮ সালে নেপালকে একীভূত করে কাঠমান্ডুকে রাজধানী করে। এরপর সিনো-নেপালি যুদ্ধ (১৭৮৮-১৭৯১) এবং অ্যাঙ্গলো-নেপালি যুদ্ধ (১৮১৪-১৮১৬) হয়, যাতে ভূখণ্ড হারায় কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষা করে। রানা রাজবংশ ১৮৪৬ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসক হিসেবে শাসন করে, দেশকে বিচ্ছিন্ন রাখে কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের সাথে মিত্রতা করে। ১৯৫১ সালের বিপ্লবে রানা শাসনের অবসান হয় এবং রাজা ত্রিভুবনের নেতৃত্বে গণতন্ত্র চালু হয়। ১৯৫৯ সালে সংবিধান হয় কিন্তু ১৯৬০ সালে রাজা মহেন্দ্র পঞ্চায়ত ব্যবস্থা চালু করে দলহীন শাসন করে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল হয়।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলা মাওবাদী আন্দোলন ছিল নেপালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (মাওবাদী) নেতৃত্বে এই আন্দোলন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুরু হয়, যাতে দাবি ছিল সমতা, ভূমিসংস্কার এবং দুর্নীতির অবসান। এই গৃহযুদ্ধে প্রায় ১৭,০০০ মানুষ মারা যায়, এবং এটি শেষ হয় ২০০৬ সালে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে। মাওবাদীরা সরকারে অংশ নেয়, কিন্তু এর ফলে নেপালের অর্থনীতি ধ্বংস হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে।

এই অস্থিরতার মধ্যে ২০০১ সালের ১ জুন নেপালের রাজপরিবারের সপারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা রাজতন্ত্রের জন্য একটি মারাত্মক ধাক্কা হয়। ক্রাউন প্রিন্স ডিপেন্দ্র নারায়ণহিতি প্রাসাদে একটি পারিবারিক সমাবেশের সময় রাজা বীরেন্দ্র, রানী এইশ্বর্যা সহ নয় জন রাজপরিবারের সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেন এবং নিজেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কোমায় থাকাকালীন তাকে রাজা ঘোষণা করা হয়, কিন্তু তিন দিন পর তার মৃত্যুর পর তার চাচা জ্ঞানেন্দ্র রাজা হন। এই ঘটনা রাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয় এবং পরবর্তীকালে উচ্ছেদের পথ প্রশস্ত করে।

এরপর ২০০৮ সালে নেপালের সংবিধান সভা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘোষণা করে এবং রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে নেপালকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই পরিবর্তন ছিল ২০০৬ সালের দ্বিতীয় জনআন্দোলনের ফল, যেখানে জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভ রাজার একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং গণতন্ত্র পুনর্বহালের পথ প্রশস্ত করে। জনআন্দোলন’ বলতে নেপালের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা জনগণের আন্দোলন বোঝায়, যা দুটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত: প্রথম জনআন্দোলন (১৯৯০) এবং দ্বিতীয় জনআন্দোলন (২০০৬)।

রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর নেপালে হিন্দু রাষ্ট্রের পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু হয়, যা অনেক হিন্দু এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। মাওবাদী আন্দোলন এবং রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর নেপালে বারবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক সমস্যা অমীমাংসিত রয়েছে। ২০২৫ সালের অভ্যুত্থানে কিছু প্রতিবাদকারী রাজতন্ত্র পুনর্বহাল এবং হিন্দু রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে, যা অতীতের এই ঘটনাগুলোর সাথে যুক্ত। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমান অভ্যুত্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ তরুণরা অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পরিবর্তন চায়।

মিউজিক্যাল চেয়ারে প্রধানমন্ত্রী

২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলোপের পর নেপালের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে গভীর টানাপোড়ন শুরু হয়, যা দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবং ঘনঘন সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম সংবিধান সভা (২০০৮-২০১২) ব্যর্থ হয়ে যায় কারণ মাদেশী, থারু এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের দাবি নিয়ে মতভেদ, যা দ্বিতীয় সংবিধান সভা (২০১৩-২০১৫) গঠনের দিকে নিয়ে যায়; ২০১৫ সালে গৃহীত সংবিধানও বিতর্কিত হয় কারণ এতে ফেডারেলিজম, নাগরিকতা এবং প্রতিনিধিত্বের ইস্যুতে মাদেশীদের অসন্তোষ জন্মায়, যা প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু এবং ভারতের সাথে ব্লকেডের মতো ঘটনায় পরিণত হয়। এই সময়কালে (২০০৮-২০২৫) প্রায় ১৪টি সরকার গঠিত হয়েছে, যেখানে পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) ৩ বার, কে পি শর্মা ওলি ৩ বার, শের বাহাদুর দেউবা ৫ বার এবং অন্যান্যরা মিলিয়ে প্রায় ১০ জন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর পদকে ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ এর মতো করে তুলেছে।

সাধারণ নির্বাচন হয়েছে ৪টি: ২০০৮ (প্রথম সংবিধান সভা), ২০১৩ (দ্বিতীয় সংবিধান সভা), ২০১৭ এবং ২০২২। রাজনৈতিক জোটের ঘনঘন পরিবর্তন দেখা গেছে, যেমন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল) এবং মাওবাদী সেন্টারের জোট, নেপালি কংগ্রেসের সাথে ইউএমএল বা মাওবাদীর জোট, যা অস্থিরতা বাড়িয়েছে। বৈদেশিক নীতিতে ভারতের সাথে সংঘাত বেড়েছে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের সংবিধানের পর বর্ডার ডিসপিউট (লিপুলেখ, কালাপানি) এবং অর্থনৈতিক ব্লকেডের কারণে, যা নেপালকে চীনের প্রভাবের দিকে ঠেলে দিয়েছে—চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগদান এবং অর্থনৈতিক সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য স্থাপনের চেষ্টা চলছে।

কেন এই অভ্যুত্থান? কারণসমূহ

২০২৫ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণ ছিল সরকারের সামাজিক মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা, যা তরুণদের মধ্যে বিস্ফোরক অসন্তোষ তৈরি করে। সরকার ২০টিরও বেশি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্লক করে, যার মধ্যে ছিল ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এবং টিকটক। এটিকে সরকার ‘সাইবার নিরাপত্তা’ বলে দাবি করলেও, তরুণরা এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হামলা বলে দেখেছে। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল শেষ ট্রিগার, কিন্তু মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব।

নেপালের অর্থনীতি কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে সংকটে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০% এর উপরে, এবং অনেকে বিদেশে চাকরির জন্য পালিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি সূচকে নেপালের অবস্থান নিম্নমুখী, এবং সরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা জনগণের অর্থ লুট করছে। জেন জি (১৩-২৮ বছর বয়সী) তরুণরা, যারা দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ, এই অসমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। তারা বলছে, “আমাদের স্বপ্ন চুরি করা হয়েছে।” অতীতের মাওবাদী আন্দোলনের মতো, এখানেও অর্থনৈতিক অসমতা এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি মূল কারণ। কিন্তু এবার নেতৃত্বহীন এবং সোশ্যাল মিডিয়া-চালিত এই আন্দোলন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া, কিছু প্রতিবাদে হিন্দু রাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবি উঠেছে, যা ২০০৮ সালের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে।

অভ্যুত্থানকারীদের দাবি

প্রতিবাদকারীদের দাবি ছিল বহুমুখী। প্রধান দাবি ছিল সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যা পরে সরকার করেছে কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা চেয়েছে। জেন জি প্রতিবাদকারীরা বলছে, “আমরা চাই একটি দেশ যেখানে সুযোগ সমান, দুর্নীতি নেই এবং তরুণদের কণ্ঠস্বর শোনা হয়।” কিছু গ্রুপ হিন্দু রাষ্ট্র এবং রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবি তুলেছে, যা অতীতের রাজতন্ত্রপ্রেমীদের সাথে যুক্ত। তারা দাবি করেছে যে ধর্মনিরপেক্ষতা নেপালের সাংস্কৃতিক পরিচয় নষ্ট করছে। এছাড়া, প্রতিবাদে মিনিমাম রিটুইট, লাইক এবং রিপ্লাইয়ের মতো সোশ্যাল মিডিয়া মেট্রিকস ব্যবহার করে তারা আন্দোলনকে ছড়িয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনও ছিল, যা পরে সুশিলা কার্কির নেতৃত্বে হয়েছে। এই দাবিগুলো তরুণদের অসন্তোষের প্রতিফলন, যা অতীতের মাওবাদী আন্দোলনের মতো সমতা-ভিত্তিক কিন্তু আরও আধুনিক।

ক্ষয়ক্ষতি: মানুষীয় এবং অর্থনৈতিক

এই অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি বিপুল। ৮-৯ সেপ্টেম্বরে প্রতিবাদ চরমে উঠলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে অন্তত ২২ জন মারা যায়, যার মধ্যে ৩ জন পুলিশ অফিসারকে লিঞ্চ করা হয়। শতাধিক আহত হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, অ্যান্টি-করাপশন কোর্ট এবং মন্ত্রীদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠমান্ডুর হিলটন হোটেলসহ হাজার হাজার ভবন লুটপাট হয়। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যায়, যা পর্যটনকে ধ্বংস করে। জেল থেকে ১৩,০০০ বন্দী পালায়, যা দেশে অরাজকতা তৈরি করে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি অপরিসীম। পর্যটন, যা নেপালের প্রধান আয়ের উৎস, থমকে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, এবং সরকারী রেকর্ড ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা যায়, এবং ফাইন্যান্স মিনিস্টারকে মারধর করা হয়। সেনাবাহিনীকে ডেকে আনা হয় শান্তি ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু এটি দেশের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ক্ষয়ক্ষতি অতীতের মাওবাদী যুদ্ধের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, যেখানে অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছিল।

সুশীলা কার্কি: অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী

সুশীলা কার্কি নেপালের একজন বিশিষ্ট আইনবিদ এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, যিনি এই পদে অধিষ্ঠিত প্রথম এবং একমাত্র নারী। তিনি ১১ জুলাই ২০১৬ তারিখে প্রধান বিচারপতি হন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতির জন্য পরিচিত। ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল মাওবাদী সেন্টার ও নেপালি কংগ্রেস তার বিরুদ্ধে সংসদে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করে, কিন্তু জনসাধারণের চাপ এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পর প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করা হয়।

২০২৫ সালের জেনারেশন জেড বিক্ষোভের ফলে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের পর, কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি মনোনীত হন, যা নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নিয়োগকে চিহ্নিত করে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে নেপালের সংবিধানের ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি শপথ নেন এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। কার্কি একটি কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন এবং তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় বিরাটনগর মহেন্দ্র মোরাং ক্যাম্পাস থেকে বিএ ডিগ্রি (১৯৭২), তারপর বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স (১৯৭৫) এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি (১৯৭৮)। ১৯৭৯ সালে তিনি আইন পেশা শুরু করেন, ২০০৭ সালে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হন এবং ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ পান। ২০১৬ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হন।

তার ব্যক্তিগত জীবনে চমকপ্রদ অংশ হলো তার স্বামী দুর্গা প্রসাদ সুবেদী, যিনি নেপালি কংগ্রেসের যুব নেতা ছিলেন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ জুন রয়্যাল নেপাল এয়ারলাইন্সের একটি প্লেন হাইজ্যাক করেন—যা নেপালের ইতিহাসে প্রথম বিমান ছিনতাই। সেই প্লেনে ১৯ জন যাত্রীর মধ্যে বলিউড অভিনেত্রী মালা সিনহা উপস্থিত ছিলেন! এটি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অর্থ সংগ্রহের জন্য করা হয়েছিল, এবং মাস্টারমাইন্ড ছিলেন গিরিজা প্রসাদ কোইরালা (নেপালি কংগ্রেসে নেতা এবং পরবর্তীতে দেশটির চার বারের প্রধানমন্ত্রী)। হাইজ্যাকাররা প্লেনটিকে ভারতের ফর্বসগঞ্জে ল্যান্ড করিয়ে ৩০ লক্ষ নেপালি রুপি লুট করে, যা সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য ব্যবহার হয়। সুবেদী পরে তার স্মৃতিকথায় এটি বর্ণনা করেছেন।

এছাড়া, আরও কয়েকটি চমকপ্রদ তথ্য হল: ৭৩ বছর বয়সী কার্কি জেন জি (১৮-২৫ বছরের তরুণদের) প্রতিবাদকারীদের পছন্দের নেত্রী হয়েছেন, যা একটি অসাধারণ বয়সের বৈপরীত্য—তরুণরা তাকে দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা হিসেবে দেখে। বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় তিনি গরমে গঙ্গার ধারে ছাদে ঘুমাতেন, এবং ভারতের সাথে তার গভীর সংযোগ রয়েছে—তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে নেপাল-ভারতের সম্পর্ক “মানুষ থেকে মানুষের”। ২০১৮ সালে তিনি “Nyaya” নামে একটি অটোবায়োগ্রাফি প্রকাশ করেন, যাতে তার জীবনের লড়াই এবং বিচারক হিসেবে অভিজ্ঞতা খোলামেলাভাবে বর্ণিত—যা একজন বিচারপতির জন্য অস্বাভাবিক। ২০১৭ সালের অভিশংসন প্রস্তাবে তাকে “বায়াসড ভার্ডিক্ট” এর অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়, কিন্তু জনচাপে এটি প্রত্যাহার হয়—এটি তার শক্তিশালী জনসমর্থনের প্রমাণ।

এই নিয়োগকে ইউএন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বাগত জানিয়েছে, এবং এটি নেপালের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের একটি মাইলফলক।

বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর তরুণরা এখন রাস্তা পরিষ্কার করছে এবং পুনর্নির্মাণে সাহায্য করছে, যা আশার আলো। কিন্তু চ্যালেঞ্জ রয়েছে: জেল পালানো বন্দীদের ধরা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচন। কিছু বিশ্লেষক এই গণঅভ্যুত্থানকে ‘কালার রেভোলিউশন’ বলে অভিহিত করছেন। এই ধরনের বিপ্লব সাধারণত বহিরাগত শক্তির, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর, প্রভাবে সংগঠিত হয় বলে ধারণা করা হয়, যেমনটি পূর্ব ইউরোপে ইউক্রেনের ‘অরেঞ্জ রেভোলিউশন’ (২০০৪) বা জর্জিয়ার ‘রোজ রেভোলিউশন’ (২০০৩)-এ দেখা গেছে। এই দৃষ্টিকোণের পক্ষে যুক্তি হলো:

  • টাইমিং: নেপাল চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (BRI) যোগ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র নেপালের জন্য আর্থিক সহায়তা (Aid) স্থগিত করে, যা কিছু বিশ্লেষকের মতে এই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করেছে। এটি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়, কারণ নেপালের BRI-তে যোগদান পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর।
  • সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা: এই আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এবং ডিসকর্ডের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়েছে, যা কালার রেভোলিউশনের একটি বৈশিষ্ট্য। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রশিক্ষিত সাইবার অ্যাক্টিভিস্টরা প্রায়ই এ ধরনের আন্দোলনকে উৎসাহিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
  • তরুণ-নেতৃত্ব: জেন জি (১৮-২৫ বছর বয়সী) তরুণদের নেতৃত্ব এই আন্দোলনকে গতিশীল করেছে, যা কালার রেভোলিউশনের আরেকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, কারণ তরুণরা প্রায়ই পরিবর্তনের জন্য বহিরাগত প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীল হয়।
  • পশ্চিমা প্রভাবের অভিযোগ: কিছু বিশ্লেষক দাবি করেন যে এই আন্দোলনে পশ্চিমা শক্তি, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের CIA বা তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর হাত থাকতে পারে। তারা মনে করেন, নেপালের চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো এই অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছে।

যাই হোক, তরুণরা এই আন্দোলনকে সত্যিকারের বিদ্রোহ বলে দাবি করে। তারা বলছে, এটি দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং সুযোগের অভাবের বিরুদ্ধে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, যা কোনো বহিরাগত শক্তির হাতে পরিচালিত নয়। কিছু বিশ্লেষকও তাদের সমর্থন করে বলছেন, এই আন্দোলন সম্পূর্ণ অর্গানিক এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *