দেশে দেশে কীভাবে হয় ভোট

দেশে দেশে কীভাবে হয় ভোট | দেশ দেশে নির্বাচন ব্যাবস্থা

দেশে দেশে কীভাবে হয় ভোট | দেশ দেশে নির্বাচন ব্যাবস্থা

দেশে দেশে কীভাবে হয় ভোট | দেশ দেশে নির্বাচন ব্যাবস্থা
দেশে দেশে কীভাবে হয় ভোট | দেশ দেশে নির্বাচন ব্যাবস্থা

নির্বাচন হলো সাংবিধানিক নিয়ম অনুসরণ করে জনগণের মতামত জানানোর ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে জনগণ কোনো ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আসার জন্য নির্বাচিত করে। বহু দেশেই নির্বাচনী সংস্কার আন্দোলন বেড়ে উঠছে, এতে অ্যাপ্রুভাল ভোটিং, সিঙ্গেল ট্রান্সফারেবল ভোট, ইনস্ট্যান্ট রান অব ভোটিং অথবা কনডোরসেট ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করা হচ্ছে। কিছু দেশে ছোটখাটো ভোটে এই পদ্ধতিগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। যদিও সে দেশগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে এখনো সেই প্রথাগত গণনা পদ্ধতিই ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখে নেওয়া যাক নির্বাচনের জন্য উল্লেখযোগ্য কোন দেশে কীভাবে নির্বাচন হয় :

যুক্তরাজ্য : ত্রয়োদশ শতকে যুক্তরাজ্যে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে আধুনিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। এখানে ওয়েস্টমিনস্টার ঘরানার দিকক্ষীয় শাসন ব্যবস্থা চালু আছে। আপার হাউস বা উচ্চকক্ষ, যাকে বলা হয় হাউস অব লর্ডস বা লর্ডস সভা এবং লোয়ার হাউস বা নিম্নকক্ষ, যাকে বলা হয় হাউস অব কমন্স বা কমন্স সভা। হাউস ১ অব কমন্সে নির্বাচিত হয়
সাধারণ ভোটারদের ভোটে। এ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হন, তারা হন কমন্স সভার সদস্য বা এমপি এবং এদের সদস্য পদের মেয়াদ থাকে পাঁচ বছর। পার্লামেন্টে নিম্নকক্ষে এরাই হন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী। এমপিদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা। অন্যদিকে উচ্চকক্ষে লর্ডরা সদস্য হন তাদের বংশগত যোগ্যতায় অথবা সরকারের মনোনয়নে। এদের সদস্য পদের মেয়াদ থাকে আজীবন অথবা স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া পর্যন্ত। নিম্নকক্ষের মাধ্যমে পাস হওয়া কোনো বিল পর্যালোচনা করা এবং সেটা পুনর্বিবেচনার জন্য আবার নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠানো ছাড়া আর বিশেষ কোনো ক্ষমতা লর্ডদের নেই। যুক্তরাজ্যে নির্বাচনের সময় বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : এই দেশের নির্বাচনগুলো যুক্তরাষ্ট্রীয়, রাষ্ট্রীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। ফেডারেল পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী কলেজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক নির্বাচিত অফিস রয়েছে, প্রতিটি রাজ্যে অন্তত একটি নির্বাচিত গভর্নর এবং আইনসভা আছে। স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সিল, শহর, শহরশাসন, ব্যুরো ও গ্রামগুলোতে নির্বাচিত অফিস রয়েছে। ২০১২ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ ১৯ হাজার ৬৪২ জন নির্বাচিত কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
কংগ্রেসীয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতি চার বছরে একযোগে অনুষ্ঠিত হয় এবং মধ্যবর্তী কংগ্রেসীয় নির্বাচন হয় দুই বছর অন্তর। সিনেটে ১০০ সদস্য এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ৪৩৫ সদস্য নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী, সাত বছর ধরে দেশটির নাগরিক হওয়া এবং তারা যে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার (আইনি) বাসিন্দা হতে হবে। সিনেটর অন্তত ৩০ বছর বয়সী, কমপক্ষে নয় বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং তারা যে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার (আইনি) বাসিন্দা হতে হবে। রাষ্ট্রপতি অন্তত ৩৫ বছর বয়সী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক এবং অন্তত ১৪ বছর ধরে দেশে বাস করছেন।

ভারত : বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশটির শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রীয়। কেন্দ্রে এবং রাজ্যগুলোতে আলাদা আলাদা আইনসভা রয়েছে। কেন্দ্রের আইনসভার নাম সংসদ। ভারতীয় সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট লোকসভারাজ্যসভা। লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি আসন। সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে দেশের জনগণ এই ৫৪৩টি আসনের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হয়। রাজ্যসভার সদস্যসংখ্যা ২৪৫। এদের মধ্যে ২৩৩ জনকে নির্বাচিত করেন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আইনসভার সদস্যরা। রাজ্যসভার সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর নেন। রাজ্যসভার বাকি ১২ সদস্যকে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে মনোনয়ন করা হয়।
ভারতের কোনো কোনো রাজ্যের আইনসভা এক কক্ষবিশিষ্ট, নাম বিধানসভা। কোনো কোনো রাজ্যের আইনসভায় দুটি কক্ষ রয়েছে বিধানসভাবিধান পরিষদ। বিধানসভার সদস্যরা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। আর বিধান পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হন রাজ্যসভার সদস্যদের মতো পরোক্ষভাবে। ভারতে নির্বাচনের সময়ও বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকে।

জাপান : দেশটির সরকার একটি সংসদীয় রাজতন্ত্র, অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় সম্রাটের ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক ও সীমিত। ১৯৪৭ সালের প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী জাপান সরকার পরিচালিত হয়। ক্যাবিনেট দেশের শাসন বিভাগের সমস্ত ক্ষমতার উৎস এবং সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদ বা ডায়েট এবং তাকে নিয়োগ দেন সম্রাট। জাপানের ন্যাশনাল ডায়েট দ্বিকক্ষীয় আইনসভা। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ৪৮০ সদস্যবিশিষ্ট। এ কক্ষের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, মেয়াদ চার বছর বা ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত। অপর কক্ষ হাউস অব কাউন্সিল সদস্যসংখ্যা ২৪২। এ কক্ষের সদস্যরা জনগণের ভোটে ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন।

রাশিয়া : একটি আধা রাষ্ট্রপতি শাসিত দেশ রাশিয়া, যেখানে প্রেসিডেন্ট সর্বক্ষমতার মালিক। ‘স্টেট দুমা’ রাশিয়া সরকারের আইনসভার অন্যতম অংশ এবং জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ হিসেবে পরিচিত। উচ্চকক্ষ হিসেবে রয়েছে ফেডারেশন কাউন্সিল। এর আসনসংখ্যা ৪৫০। সংসদ সদস্যদের ডেপুটি হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২১ বা তদূর্ধ্ব বয়সী যে কোনো রুশ নাগরিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হন। ‘স্টেট দুমা’র ডেপুটি থাকাবস্থায় ফেডারেশন কাউন্সিলের ডেপুটি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া যায় না। এ ছাড়াও ‘স্টেট দুমা’র ডেপুটি অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা কিংবা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারের কোনো কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। তার কার্যালয়টিই পূর্ণাঙ্গকালীন নির্ধারিত ও একটি পেশাদার পদ।

শ্রীলংকা : দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকার সংসদ নির্বাচন কিছুটা জটিল। গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী শ্রীলংকার মোট সংসদীয় আসনসংখ্যা ২২৫টি। এর মধ্যে ১৯৬টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং বাকিগুলোতে নির্বাচন হয় আনুপাতিক হারে। এই ২৯ সংসদ সদস্যের পদকে বলা হয় ন্যাশনালিস্ট। একজন ভোটার ব্যালটে প্রথমে একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন। তার পর ভোটার সেই পার্টির সর্বোচ্চ তিনজনকে ভোট দিতে পারবেন। ভোটাররা যখন ভোট দেবেন তখন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যে কোনো তিনজনকে ভোট দিতে পারবেন। এটাকে বলা হয় প্রিফারেন্সিয়াল ভোট। আবার ইচ্ছে করলে সিঙ্গেল ভোটও দিতে পারবেন। প্রথমে এক পার্টিকে ভোট দিয়ে পরে অন্য পার্টির মনোনীত ব্যক্তিকে ভোট দিলে তা বাতিল হয়ে যাবে। এ ছাড়া মূল নির্বাচনের আগে ছিল পোস্টাল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা। প্রতিটি জেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই পোস্টাল ভোটে অংশ নেন ভোট গ্রহণের কয়েক দিন আগে। সেখানে মোট ১৩টি নির্বাচনী এলাকা থেকে ১২ জন নির্বাচিত হবেন। এক একটি রাজনৈতিক দল ১২টি সংসদ সদস্য পদের জন্য ১৫ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়।

নেপাল : ২০০৮ সালের মে পর্যন্ত নেপাল একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ছিল। ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ওই মাসের ২৮ তারিখে দেশটির আইনসভা সংবিধানে সংশোধন আনে এবং নেপালকে একটি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করে। বর্তমানে নেপালের রাজনীতি একটি বহুদলীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোতে সংগঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারপ্রধান। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। আইনসভার ওপর আইন প্রণয়নের দায়িত্ব। দেশটি ইউরোপের জার্মানিসহ অনেক দেশে যে আনুপাতিক ব্যবস্থা রয়েছে তার সঙ্গে ব্রিটিশ পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি মিশ্র প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করেছে, যাকে একটি অনন্য পদ্ধতি বলা যায়। এ ব্যবস্থা অনুসারে নেপালে ২৭৫ আসনবিশিষ্ট সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে (১৬৫) ব্রিটিশ পদ্ধতি অনুসারে নির্বাচন হয়। যেখানে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ আসনে (১১০) দলের পক্ষে যে ভোট পড়ে, তার ভিত্তিতে আগে জমা দেওয়া তালিকা থেকে ক্রমানুসারে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়।

ভুটান : সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ভুটানের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। একটি উচ্চকক্ষ, ন্যাশনাল কাউন্সিল বা জাতীয় পরিষদ এবং নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদ নিয়ে গঠিত। উচ্চকক্ষ ২৫ সদস্য নিয়ে গঠিত, যার ২০ জন সদস্য আসে প্রতিটি জেলা থেকে নির্বাচিত হয়ে এবং ৫ জনকে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নিযুক্ত করেন দেশটির রাজা। এই প্রার্থীরা রাজনৈতিক দলের সদস্য থাকতে পারেন না। আর নিম্নকক্ষ গঠিত হয় সর্বোচ্চ ৫৫ সদস্যকে নিয়ে। যাদেরকে সরাসরি নাগরিকদের ভোটে প্রতিটি জেলা থেকে নির্বাচিত করা হয়। তারা সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য থাকতে পারেন।
কিংডম অব ভুটানের সংবিধান অনুযায়ী দুই দফা নির্বাচন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রথম দফায় সব অংশগ্রহণকারী দলকে ভোটাররা ভোট দেন। এ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দুটি দল দ্বিতীয় দফা বা চূড়ান্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। এতে বিজয়ী দলটি সরকার গঠন করে।

Read Previous

যেভাবে এলো নির্বাচন

Read Next

চা শিল্প | উন্নয়ন সময় | শিল্পোন্নয়নে বাংলাদেশ

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.