পরিসংখ্যানবিদ হিসাবে ক্যারিয়ার

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন পরিসংখ্যানবিদ বা স্ট্যাটিস্টিশিয়ান। শিক্ষা থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প – সব ক্ষেত্রেই এ পেশার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে পরিসংখ্যানের ব্যবহার। ফলে দিন দিন বাড়ছে পরিসংখ্যানবিদের কাজের সুযোগ। সংখ্যা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করতে চায়লে বেছে নিতে পারেন ‘পরিসংখ্যান’।

পরিসংখ্যানবিদ

পরিসংখ্যানবিদ কে?

এক ধরনের গাণিতিক বিজ্ঞান (Mathematical Science) যা মূলত উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও উপাত্ত সহজে পরিবেশন নিয়ে কাজ করে। বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক এবং আরো নানা শাখায় পরিসংখ্যানের ব্যবহার রয়েছে। উপাত্ত বিশ্লেষন করে তা থেকে তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত (informed decision) গ্রহণে পরিসংখ্যানের ভূমিকা অপরিহার্য। যে কোনো ধরনের গবেষণার জন্য পরিসংখ্যানের মৌলিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে পরিসংখ্যান স্বীকৃতি লাভ করে।

যারা পরিসংখ্যানের চর্চা করেন তাদেরকে সাধারনভাবে পরিসংখ্যানবিদ বা স্ট্যাটিস্টিশিয়ান বলা হয়।

কাজের সুযোগ

আমাদের দেশে মূলত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠানে পরিসংখ্যানবিদদের কাজের সুযোগ রয়েছে। আইটি থেকে শুরু করে অর্থনীতি, অটোমোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস / মেডিসিন, মনোবিজ্ঞান, মার্কেটিং, জনস্বাস্থ্য, জীববিজ্ঞান এবং প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, প্রোডাকশনসহ নানা সেক্টরে পরিসংখ্যান পড়ুয়াদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

  • বিসিএসে পরিসংখ্যানের পড়ুয়াদের জন্য বিসিএস (সাধারণ) ছাড়াও বিসিএস (পরিসংখ্যান) ও বিসিএস (প্রভাষক) রয়েছে। বিসিএস-টেকনিক্যাল ক্যাডারে প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে একজন পরিসংখ্যান অফিসার পদ।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক (সাধারণ) এর পাশাপাশি সহকারী পরিচালক (পরিসংখ্যান) ও সহকারী পরিচালক (গবেষণা) নামে আলাদা দুটি ফিল্ড আছে যাতে পরিসংখ্যান/ফলিত পরিসংখ্যান/অর্থনীতি বিভাগের পড়ুয়াদের জন্য।
  • যেকোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান মানেই পরিসংখ্যান/ফলিত পরিসংখ্যানের ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা ।
  • সরকারি পর্যায়ে পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিসংখ্যানের গ্রাজুয়েটদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
  • বেসরকারি পর্যায়েও ব্যাংক ইনস্যুরেন্স, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যানবিদ ছড়া অচল।
  • আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কাজের বেশ সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি),ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে চাকরি পাবার জন্য উচ্চশিক্ষা যেমন এমএস, পিএইচডি প্রভৃতি থাকলে ভাল হয়। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে।

দায়িত্ব

  • ডেটা অ্যাকুইজিশন ট্রায়াল ডিজাইন করা
  • তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পরীক্ষা ও জরিপের প্রশ্ন তৈরি করা
  • তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পরীক্ষা ও জরিপের সামগ্রিক পরিকল্পনা বানানো
  • তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পরিকল্পিত পরীক্ষা ও জরিপ আইনসম্মত ও নৈতিক কি না, তা খতিয়ে দেখা
  • পরীক্ষা ও জরিপ চালিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা
  • জটিল ডেটাতে পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগ করা
  • প্রবণতা বিশ্লেষণ অর্থাৎ সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তার গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা
  • তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া ফলাফলে গাণিতিক কোন ভুল আছে কি না, তা পরীক্ষা করা
  • ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা
  • প্রাপ্ত ফলাফলকে কীভাবে বাস্তব সমস্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়া
  • তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়াকে কীভাবে আরো মানসম্মত করা যায়, তার উপর গবেষণা করা
  • ডেটা সংগ্রহ/ব্যবস্থাপনা কম্পিউটার সিস্টেম এবং সফ্টওয়্যার ডিজাইন এবং বাস্তবায়ন
  • অধস্তন পরিসংখ্যান কর্মীদের তত্ত্বাবধান
  • পরিসংখ্যান ব্যবহার করে পূর্বাভাস তৈরি করা এবং প্রজেক্টেড ফিগারস প্রদান করা
  • বিভিন্ন ফরম্যাটে তথ্য উপস্থাপন করা
  • বিশেষজ্ঞ নয় এমন ব্যক্তিদের কাছে জটিল তথ্য সহজ বোধ্যভাবে পৌঁছে দেওয়া

যোগ্যতা

শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণত পরিসংখ্যান, গণিত বা অর্থনীতিতে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়।

বয়স: প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষে বয়সের সীমা নির্ধারিত হয়।

অভিজ্ঞতা: এ পেশায় অভিজ্ঞদের প্রাধান্য রয়েছে। সাধারণত ১-২ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে আসে।

দক্ষতা জ্ঞান

একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসাবে কাজ করার প্রথম শর্ত হচ্ছে ভালো গাণিতিক জ্ঞান থাকা। এর সাথে নিচের দক্ষতাগুলো থাকা জরুরি:

  • পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি, কৌশল, সূত্র এবং পরীক্ষার উন্নত জ্ঞান
  • কোন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তকে চিহ্নিত করতে পারা
  • ডেটা ব্যাখ্যা করার এবং প্রবণতা বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি শিল্পের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পূর্বাভাস প্রস্তুত করার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা
  • তথ্য-উপাত্তকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা
  • পরিসংখ্যানে দক্ষতা
  • কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্য-উপাত্তের মডেল তৈরি করতে পারা
  • প্রতিবেদনে ফলাফলের সারসংক্ষেপ এবং উপস্থাপনে ব্যাপক অভিজ্ঞতা
  • গবেষণার ফলাফলের উপর গোছানোভাবে প্রতিবেদন লেখার ক্ষমতা

ডাটা বিশ্লেষণে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ জানা থাকলে বর্তমানে যেকোন প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার পাবেন। যেমন: Python, SQL, Java, SPSS এবং R, বা সমতুল্য সহ পরিসংখ্যানগত সফ্টওয়্যার প্রোগ্রামগুলিতে দক্ষতা

দক্ষভাবে কাজ করতে আপনাকে আরো কয়েকটি বিষয়ে ভালো হতে হবে। যেমন:

  • এডভান্স বিজনেস অপারেশন এবং শিল্প জ্ঞান
  • খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়া
  • বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারা
  • রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির উপর পরিষ্কার ধারণা রাখা
  • দলগত কাজ করতে পারা
  • তথ্য সংগ্রহের সমন্বয় করতে অন্যান্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা
  • সমস্যা সমাধানে দক্ষতা
  • পরিসংখ্যানের ব্যাপারে ধারণা কম, এমন মানুষের কাছে তথ্য-উপাত্ত আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করতে পারা
  • একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ এবং/অথবা সার্টিফিকেশন

পড়াশোনা

দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পরিসংখ্যান বা Applied Statistics নামের একই ধরনের আরো একটি বিষয় পড়ানো হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতর শুধু মাত্র ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় (EWU) তে অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিসটিকস পড়ানো হয়। এছাড়া গণিত নিয়ে পড়েও এ পেশায় আপনি সহজে যোগ দিতে পারেন।

আয়রোজগার

প্রাথমিকভাবে একজন ট্রেইনি পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলে মাসিক ৳১৫,০০০ থেকে ৳২০,০০০ উপার্জনের সুযোগ আছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের দক্ষতার ভিত্তিতে এ পেশায় মাসিক আয়ের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।

ক্যারিয়ার গ্রাফ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অধীনে প্রতি বছর এন্ট্রি লেভেলে থানা পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া পরিসংখ্যান সহকারী বা তদন্তকারী পদে কাজ করতে পারেন। কাজ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হবে আপনার।

পরিসংখ্যানবিদ, বিজনেস অ্যানালিস্ট, গণিতবিদ, অধ্যাপক, রিক্স অ্যানালিস্ট, ডাটা অ্যানালিস্ট, কনটেন্ট অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যান প্রশিক্ষক, ডেটা সায়েন্টিস্ট, পরামর্শক, জীব পরিসংখ্যানবিদ, অর্থনীতিবিদ, ডেটা সায়েন্টিস্ট, সিনিয়র বিজনেস অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ, সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সিনিয়র ডেটা অ্যানালিস্ট, এসএএস প্রোগ্রামার – বিভিন্ন ধরনের পদে একজন পরিসংখ্যানবিদ যোগদান করতে পারেন।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *