ভালোবাসা দিবসের মজার কিছু অজানা তথ্য

প্রতি বছর সারা পৃথিবীর প্রায় কয়েক কোটি লোক ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করে থাকেন। তাদের কাছে দিবসটি ভালোবাসার বাৎসরিক উৎসব হিসেবেই উৎযাপন হয়। ভালোবাসার দিন। ভালোবাসার উৎসব। প্রেমের উদযাপন। ফুল, কার্ড, চকোলেট, উপহারে মনের মানুষকে ভরিয়ে দেওয়ার দিন। এদিকে এই ভালোবাসার দিবস নিয়েই রয়েছে বেশকিছু মজার তথ্য। বেশকিছু অজানা তথ্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক, সেগুলি কী কী-

কেমন হবে স্বামী?

মধ্যযুগে ভালোবাসা দিবসে মেয়েরা তাদের ভবিষ্যত স্বামীদের কল্পনা করে নির্দিষ্ট বিশেষ কিছু খাবার খেতেন। আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে, ভালোবাসা দিবসে প্রথম প্রাণী দেখার সঙ্গে মেয়ের ভবিষ্যত স্বামী পাওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে যায়। কোনো মেয়ে কাঠবিড়াল দেখলে তার স্বামী হবে কঞ্জুস বা কৃপণস্বভাবের। ফ্লাইং রবিন পাখিকে দেখলে সেই মহিলার নাকি নাবিকের সঙ্গে বিয়ে হবে! চড়ুই পাখি দেখলে নাকি বর হবে গরিব, কিন্তু সে সুখী দাম্পত্যজীবন কাটাবে। আর গোল্ডফিশ দেখলে ওই মেয়ের স্বামী হবেন একজন বিত্তশালী ব্যক্তি।

গোলাপ কেন!

গোলাপকে ভালোবাসার ফুল ভাবা হয়। কেননা গোলাপের ইংরেজি ‘ROSE’ এর ‘E’ সামনে আনলে হয় ‘EROS’। ‘EROS’। ‘EROS’ অর্থ হচ্ছেন ভালোবাসার দেবতা।   হয়ত তাই গোলাপ ভালোসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গ্রাহামবেলকে ধন্যবাদ জানান

আপনাকে আলেক্সজান্দ্রার গ্রাহামবেলকে ধন্যবাদ জানাতে হবে। আপনার প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে ফোনে ভালোবাসার কথা জানানো সম্ভব হচ্ছে তারই অনন্য সাধারণ উদ্ভাবনের জন্য। ১৮৭৬ সালের ভ্যালেন্টাইন ডে’তে তিনি টেলিফোনের পেটেন্ট চেয়ে আবেদন করেছিলেন। হতে পারে এটি কাকতালীয় ঘটনা!

৮০ লাখ চকলেটের গায়ে শব্দ

প্রতিবছর ভালোবাসা দিবসে বিশ্বে ৮০ লাখের বেশি চকলেটে আবেগী কিছু শব্দ দিয়ে তৈরি হয়। ‘মিস ইউ’ ‘ট্রু লাভ’ ‘ইউ অ্যান্ড আই’সহ কাছে পাওয়ার বাসনাসমেত নানা শব্দ অঙ্কিত এসব চকলেটগুলো বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়। ১৮৬৬ সালে ডেনিয়েল চেস প্রথম এ হৃদয় ‍কাড়ানো শব্দের ব্যবহার করেছিলেন।

আনন্দ-বেদনার প্রতিষেধক চকলেট

ভালোবাসায় পড়েছেন বা ব্যর্থ হয়েছেন-কোনো চিন্তা নয়, চকলেট কিনে খান। চকলেট হচ্ছে সব ব্যথা আর আনন্দের অবিতর্কিত থেরাপি। ১৮ শতক থেকে প্রেমে প্রত্যক্ষাণ হওয়াদের যন্ত্রণা উপমশের জন্য চকলেট খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন চিকিৎসকেরা।

হৃদয়াকৃতির চকলেট বাক্স

১৮৮২ সালের এ দিনে প্রথম হৃদয়াকৃতির চকলেট বাক্সের প্রচলন শুরু হয়। রিচার্ড ক্যাডবেরি এর প্রবর্তক। নাম শুনেই হয়তো কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন কে এই ক্যাডবেরি। বিখ্যাত চকলেট কোম্পানি ক্যাডবেরির প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ক্যাডবেরিই ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে চকলেট দেওয়ার ব্যাপারটি প্রচলন করেছেন, যাতে করে ওই দিনটিতে সবাই বেশি বেশি করে চকোলেট কেনেন।

পরিসংখ্যান মতে, প্রতিবছর ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি হৃদয়াকৃতির চকলেট বাক্স বিক্রি হয়।

হ্যাপি স্যাড

ছ্যাকা খেলে তো চকলেট খাবেন, তবুও ভালোবাসা দিবস উদযাপন করবেন! ভালোবাসা দিবসটি ভালোবাসা দিবস হিসেবে নয় ‘একক সচেতনতা দিবস’ (সিঙ্গেল অ্যাওয়ারনেস ডে-স্যাড) পালন করুন। লাল পোশার পরিবর্তে আপনি পরুন সবুজ পোশাক।

‘জুলিয়েটের’ কাছে চিঠি

প্রতিবছর এই দিনটিতে হাজার হাজার মানুষ তাদের ভালবাসার মানুষকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখে থাকেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই নিজের প্রিয় মানুষটির কাছে চিঠিটি না পাঠিয়ে পাঠান ইতালির ভেরোনাতে। শেক্সপিয়ারের কালজয়ী প্রেমের উপন্যাস ‘রোমিও-জুলিয়েট’ এর সম্মানার্থে ভেরোনার একটি স্থান আছে জুলিয়েটের নামে। সেখানে প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার চিঠি এসে জমা হয়। জুলিয়েট ক্লাবের কিছু স্বেচ্ছাসেবী মানুষ প্রতিটি চিঠির উত্তরই দেন যত্ন সহকারে। এমনকি প্রতি বছর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী চিঠিকে দেওয়া হয় ‘কারা গুইলেইটা’ (ডিয়ার জুলিয়েট) নামক একটি পুরষ্কার। চাইলে আপনিও পারেন সেই পুরষ্কারটি বাগিয়ে নিতে।

প্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতা

পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতা ছিলো কোনটি? এ নিয়ে ঘাটতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা বের করেছেন এক চমকপ্রদ তথ্য। প্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতাটি লেখা সবচেয়ে আটপৌরে জায়গায়। একটি জেলখানায় বসে। এজিনকোর্টের যুদ্ধে ধরা পড়ে যখন জেলে দিনযাপন করছিলেন ডিউক অফ অরলিন্স খ্যাত চার্লস, ঠিক সেই সময়টাতে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর উদ্দেশ্যে কবিতাটি লিখেন তিনি। ২১ বছর বয়সী চার্লস অবশ্য কবিতাটি পড়ে স্ত্রীর অভিব্যক্তি কেমন ছিলো তা দেখতে পারেননি। কারণ তিনি জেলে ছিলেন টানা ২০ বছর। তবে সেই কবিতাটিকেই ধরা হয় সর্বপ্রথম ভ্যালেন্টাইন কবিতা হিসেবে।

ভিনেগার ভ্যালেন্টাইন

ভ্যালেন্টাইন্স ডে মানেই ভালবাসা সম্বলিত কার্ড কিংবা কোনো উপহার। কিন্তু কেমন হতো যদি ঘৃণাভরা কোনো কার্ড ১৪ ফেব্রুয়ারি আপনার বাসায় এসে উপস্থিত হয়?

১৯ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভিক্টোরিয়ান যুগে এই জিনিসটি প্রথম চালু হয়। আর এর নাম দেওয়া হয় ভিনেগার ভ্যালেন্টাইন। সাধারণত ভিনেগার ভ্যালেন্টাইনের কার্ডে ভালবাসার কথা না লিখে উপহাসসূচক কিংবা অপমানজনক কথাবার্তা লিখা থাকে। বিশেষ করা টাক কিংবা অন্যান্য শারীরিক গড়ন নিয়ে মানুষ উপহাস করে ভিনেগার ভ্যালেন্টাইন পাঠাতো। যদিও পুরো ব্যাপারটাই ছিলো নিছক মজা। কিন্তু কিছু মানুষ ব্যাপারটি হজম করতে পারেনি। ১৮৮৫ সালে এক ব্যক্তি ভিনেগার ভ্যালেন্টাইনের জের ধরে গুলি করে হত্যা করে তার স্ত্রীকে। আবার অনেকে ভিনেগার ভ্যালেন্টাইন পেয়ে আত্মহত্যা করাও শুরু করে। ফলশ্রুতিতে কার্ড কোম্পানিগুলো ভিনেগার ভ্যালেন্টাইন তৈরি করা বন্ধ করে দেয়।

ভালবাসার বাহুবন্ধনী

অনেকেই ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষে বাহুতে লাভ সম্বলিত চিহ্ন পড়ে থাকেন। কিন্তু আসলে এই ঐতিহ্য আসলো কোথা থেকে? সেটি জানার জন্য আমাদের আবার যেতে হবে রোমান রাজা ক্লদিয়াসের সময়ে। ক্লদিয়াস বিশ্বাস করতেন, বিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট একটি মেয়ের সাথে জীবন কাটাতে গেলে সৈন্যরা মায়ার জালে আটকা পড়বে, যার দরুন যুদ্ধগুলোতে তারা নিজেদের সেরাটা দিতে সক্ষম হবে না। তাই বিয়ে জিনিসটি নিষিদ্ধ করেন তিনি। আর চালু করেন অস্থায়ী যুগল। প্রতি বছর বছর সবাইকে নির্দিষ্ট দিনে নিজেদের যুগল পরিবর্তন হতো। আর সেই অনুষ্ঠানে নিজের প্রেমিকা বা যে মেয়েটি একবছরের জন্য তার যুগল হবে তার নাম সম্বলিত একটি বাহুবন্ধনী পরে থাকতো ছেলেরা, যেটি কি না একবছর ধরে পরিধান করতে হতো। আর এই প্রথা থেকেই পরবর্তীতে বাহুতে ভালবাসা সম্বলিত বন্ধনী পরার নিয়ম চালু হয়।

কিউপিড

ভালবাসার সাথে কিউপিড নামক এই গ্রিক দেবতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রাচীন গ্রিক মিথোলজি অনুযায়ী কিউপিড হচ্ছেন ভালবাসার দেবতা। তবে ইরোস নামে পরিচিত এই দেবতা ছিলেন আরেক গ্রিক দেবী আফ্রোদিতির ছেলে। নিজের সন্তানকে দুটি তীর দিয়েছিলেন তিনি, যার একটি ছিলো ভালবাসার প্রতীক, আরেকটি ঘৃণার। মিথোলজি অনুযায়ী ভালবাসার তীর দ্বারা বিদ্ধ হলে আপনি কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভালবাসায় পড়বেন। তবে কিউপিডকে তার মা আফ্রোদিতি তীর দিয়েছিলেন আদতে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতো। কিন্তু তারপরও ভালবাসা দিবসের মাস্কট হয়ে উঠেছে তীর হাতে নেওয়া বাচ্চা কিউপিডই।

খাতায় কলমে কাজের দিন

ভ্যালেন্টাইন ডে তে ছুটি না থাকলেও এই দিনই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ছুটি কাটান। মার্কিন মুলুকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ তাদের পোষ্যের জন্য ভ্যালেন্টাইন উপহার কেনেন।  

চুম্বনের প্রতীক

বহুদিন ধরেই ভালবাসা দিবসে চুম্বনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ‘এক্স‘ চিহ্নটি। তবে এই প্রতীক ব্যবহারের পেছনেও রয়েছে ইতিহাস। ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, এর শুরু হয়েছে মধ্যযুগে বা তারও আগে। সেই সময়ে লেখকরা কিংবা রাজদরবারে কোনো কিছু লেখা হলে পান্ডুলিপির উপরে ‘এক্স’ প্রতীকটি দিয়ে তাতে চুমু খেতো লেখকরা। মূলত শপথ নেওয়া হিসেবে চুমু খেতো সবাই। পরবর্তীতে সেটিই হয়ে ওঠে চুম্বনের প্রতীক। পাশাপাশি সেই সময় থেকেই ‘O’ চিহ্নটি হয়ে যায় জড়িয়ে ধরার প্রতীক।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *