বাংলাদেশের ক্রিকেটে

ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের প্রাণের খেলা হলেও ব্রিট্রিশ আমল থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী দুই দশক পর্যন্ত ফুটবলই ছিল এ দেশের প্রধান খেলা। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমণের অল্প কিছুকাল পরেই ক্রিকেট খেলার সূচনা হয়। ১৮০৪ সালের ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি ইটনীয় সিভিল সার্ভেন্ট ও কোম্পানির অন্যান্য কর্মচারীদের মধ্যে একটি আড়ম্বরপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে ভারতীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী ফার্সিস-এর আয়োজনে ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৩৪ সাল থেকে ভারতের বিখ্যাত ক্রিকেটার কে.এস রণজিৎ সিংজীর নামানুসারে রণজি ট্রফি খেলা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ চারটি দলে বিভক্ত হয়ে কায়েদে আযম ট্রফি ক্রিকেট খেলার আয়োজন করে। পাকিস্তান আমলে পূর্বে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সবকিছুর মতো ক্রিকেটেও চালিয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। দেশবিভাগ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত চব্বিশ বছরে মাত্র একজন বাঙালি পাকিস্তান জাতীয় দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হবার সুযোগ পেয়েছিল। সে সময় তৎকালীন পূর্ব বাংলার ক্রিকেটামোদীরা ঢাকা স্টেডিয়ামে (বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) টেস্ট ম্যাচ দেখেছে ঠিকই;  কিন্তু বাঙালি কোন খেলোয়াড়ের নাম দেখেনি স্কোর বোর্ডে। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে নবনির্মিত ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) প্রথম টেস্ট ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৯ সালের মাঝে এই স্টেডিয়ামে মোট ৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়। তবে পূর্ব পাকিস্তানের কোন খেলোয়াড়ের পাকিস্তানের মূল একাদশে খেলার সুযোগ হয়নি। তবে ১৯৬৯-৭০ মৌসুমে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের রকিবুল হাসান সুযোগ পান।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সাবেক ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের ক্রিকেট কমিটিকে জাতীয়ভিত্তিক করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি)-এ রূপান্তর করা হয়। ১৯৭২-৭৩ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ক্রিকেট লীগ শুরু হয়। ১৯৭৪-৭৫ সালে শুরু হয় জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া রাজশাহী, খুলনা ও দেশের অন্যান্য স্থানেও ক্রিকেট লীগ শুরু হতে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড অন্যান্য লিগ প্রতিযোগিতা, যেমন- শহীদ স্মৃতি ক্রিকেট, স্টার সামার ক্রিকেট, জাতীয় যুব ক্রিকেট, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়, দামাল সামার ক্রিকেট।

স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছর বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশর ছিলো না তেমন কোন সাফল কিংবা অগ্রগতি। এভাবে বেশ ক’বছর কাটার পর বাংলাদেশ সফরে আসেন রবিন মারলার নামক এক ব্রিটিশ সাংবাদিক। পাকিস্তান আমলে তিনি এখানে ঢাকা এসেছেন টেস্ট ম্যাচ কভার করতে। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা এসে দেখলেন, ক্রিকেট এখানে প্রায় অতীত হয়ে যাওয়া একটি শব্দ। যে দেশটি এক সময় একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশ ছিল সে দেশে ক্রিকেটের এ দৈন্যদশা অত্যন্ত পীড়া দিল রবিন মারলারকে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রথম এমসিসি (মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব) দল বাংলাদেশে খেলতে আসে। বিদেশী দলের ঢাকা আগমনের এ ধারা এরপর থেকে আর থেমে থাকেনি। সে বছরই অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ লাভ করে। এরপর একে একে বিভিন্ন দল আসতে থাকে এদেশে প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও বিদেশ সফর শুরু করে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে। সেবারের টুর্ণামেন্টে চার ম্যাচের দু’টিতে টাইগাররা জিতলেও হেরে যায় বাঁকি দুটিতে। প্রতিবেশী তিন টেস্ট দল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার টেস্ট খেলোয়াড়রাও নিয়মিত বিরতিতে ঢাকার মাঠে আসা শুরু করে প্রীতি বা প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নিতে। কিন্তু এতোকিছুর পরও ফুটবলকে ডিঙিয়ে দেশের প্রধান খেলা হতে সক্ষম হয়নি ক্রিকেট।

১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ এশিয়া কাপে সর্বপ্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচটি খেলে পাকিস্তানের বিপক্ষে।  তৃতীয় এশিয়া কাপ ক্রিকেটে সেবার ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার সাথে বাংলাদেশও অংশ নেয়। পরের বছর জুনিয়র এশিয়া কাপও অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মাঠে। এই সময় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৯৯২ সালে। সেবার বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ পায় এদেশের দর্শকরা। খেলাপাগল বাঙালিকে দারুনভাবে নাড়া দেয় সেই বিশ্বকাপ। পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেট নতুন দীগন্তে প্রবেশের উম্মোচন করে দেয়। জিম্বাবুয়েকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পূর্ন সদস্যপদ বা টেস্ট স্ট্যাটাস দিয়ে দেয়। এবং সিদ্ধান্ত হয় পরবর্তী বিশ্বকাপে আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দল খেলার সুযোগ পাবে বিশ্বকাপ। আগে খেলত কেবল চ্যাম্পিয়ন দল। তিনবারের আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ের কাছে দু’বার সেমি ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ। সুতরাং জিম্বাবুয়ের অবর্তমানে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি ক্রিকেটে ফেভারিট দল। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতে থাকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার। কোন ডিসিপ্লিনে বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা এই প্রথম। তাই দেশবাসীর মধ্যে দারুণ সাড়া পড়ে যায়। বাংলাদেশে ক্রিকেট এর জনপ্রিয়তার পরত দ্রুত উপরের দিকে উঠতে থাকে।

১৯৯৪ সালে কেনিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি ট্রফি। বাংলাদেশ অংশ নেয় ট্রফি জয়ে হট ফেভারিট হিসেবে। কিন্তু স্বপ্ন পুরণ হয় না বাংলাদেশের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অল্প ব্যবধানে কেনিয়ার কাছে হেরে হৃদয় ভেঙ্গে দেয় দেশবাসীর। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে খেলা হয় না বাংলাদেশের। আবার অপেক্ষা তিন বছরের জন্য। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় আকরাম খানের নেতৃত্বে টাইগাররা আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ান হয়ে পেয়া যায় ক্রিকেটের সর্বচ্চ আসরে খেলার যোগ্যতা।

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই টাইগাররা অংশ নেয় ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে। সেই আসরের রানার্সআপ পাকিস্তান এবং ইউরোপিয়ান কন্ডিশনে ইউরোপিয়ান দল স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা উপহার দেয় প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চমক।

১৯৯৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ওয়ানডে খেলুড়ে দেশ হিসেবে ওয়ানডে খেলে আসছিল। ২০০০ সালের ২৬ জুন তারা দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে আইসিসি’র সদস্যপদ লাভ করে। ক্রিকেটের সেরাদের মধ্যে এখন অবধারিত হয়ে উঠে আসছে বাংলাদেশের নাম।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড:

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় এই সংস্থার নাম ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি)।১৯৭৬ সালে সংস্থার খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। জানুয়ারি, ২০০৭ সালে বোর্ড কর্তৃপক্ষ ‘কন্ট্রোল’ শব্দটি বিলুপ্ত করে। ঢাকায় হোম অফ ক্রিকেট শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম এর প্রধান সদর দফতর। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানোন্নয়ন, মাঠ পরিচালনা, খেলার মাঠ নির্ধারণ, দলের সফর, দল পরিচালনা ও ক্রিকেট খেলার মানোন্নয়ন বৃদ্ধি ঘটানোসহ জাতীয় দল নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা রাখছে এ সংস্থাটি। এছাড়াও, দলের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়েও বোর্ড দায়বদ্ধ। বাংলাদেশ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসসি) ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) মাধ্যমে আয়োজিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থ এবং স্থানীয় মিডিয়া রাইটস ও টিম স্পন্সরসহ অন্যান্য স্পন্সর হতে অর্জিত অর্থ দিয়ে বোর্ডের সার্বিক ক্রিকেট কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।  গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের টিম স্পন্সর হিসেবে রয়েছে ভারত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সাহারা’। চার বছরে রেকর্ড ৭৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা আয়ের নিশ্চয়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিসিবির অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার কথা সাহারার। গত বছর ২ কোটি ২৫ হাজার ডলারে ৬ বছরের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রচার স্বত্ব পেয়েছে গাজী টিভি। বর্তমানে বিসিবি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাজমুল হাসান।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম: ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি এক সময় ১ নম্বর জাতীয় স্টেডিয়াম নামে পরিচিত ছিল। সব ধরনের খেলাই অনুষ্ঠিত হত এই মাঠে। কিন্তু বর্তমানে স্টেডিয়ামটিকে কেবল ফুটবল মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ধারনক্ষমতা প্রায় ৩৬,০০০। ২০০৫ সালের ১লা মার্চ পর্যন্ত স্টেডিয়ামটি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নিজস্ব মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হত। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম বিশ্বের একমাত্র স্টেডিয়াম যেটিতে দুটি ভিন্ন দেশের উদ্বোধনী টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুটি খেলাতেই প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। প্রথম খেলায় ১৯৫৪-৫৫ সালে তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান দল ভারতের বিপক্ষে টেস্ট খেলার মাধ্যমে টেস্ট অঙ্গনে যাত্রা শুরু করে। এর ৪৬ বছর পর ২৬ জুন, ২০০০ তারিখে, বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর প্রথম টেস্ট খেলায় ভারতের মোকাবিলা করে।

শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম: ঢাকার মিরপুরে ২৬,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটি স্থাপিত হয় ২০০৬ সালে। এটি বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট, টেস্ট, ওয়ান-ডে, টুয়েন্টি২০ এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের নিজস্ব মাঠ। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অন্যতম ভেন্যু হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়।

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম: এটি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম হিসেবে পূর্বে পরিচিত ছিল। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়াম হিসেবে স্টেডিয়ামটির পরিচিতি রয়েছে। ২০,০০০ দর্শক ধারন ক্ষমতা সম্মন্ন এই স্টেডিয়ামটি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সাগরিকায় এটি অবস্থিত। ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপে এই মাঠে গ্রুপ-পর্বের দুইটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়।

এম এ আজিজ স্টেডিয়াম: এটি চট্টগ্রামের প্রধান স্টেডিয়াম। স্থানীয় ক্রিকেট এবং ফুটবল ম্যাচ এই মাঠে খেলা হয়। এই স্টেডিয়ামের মোট ধারন ক্ষমতা ২০,০০০। এই স্টেডিয়ামটি ১৯৭৭ সালে তৈরি করা হয়। এই স্টেডিয়ামে প্রথম ওয়ান-ডে ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ২৭ অক্টোবর উইলস এশিয়া কাপে।

খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত এই স্টেডিয়াম নারায়ণগঞ্জ ওসমানী স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত। এটির ধারন ক্ষমতা ২৫,০০০। ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে এই স্টেডিয়ামটি ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের সময় এই মাঠে ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ হয়েছিল।

শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম: পূর্বের নাম ছিল বগুড়া বিভাগীয় স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামে একটি মাত্র টেস্ট ম্যাচ (বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা) হয়েছিল ২০০৬ সালে। এছাড়া এই স্টেডিয়ামে হওয়া পাঁচটি ওয়ানডের মধ্যে চারটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এই স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা ১৫,০০০।

শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম: খুলনার এই স্টেডিয়ামটি দেশের সপ্তম টেস্ট ভেন্যু। স্টেডিয়ামটি খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত। ২০০৪ সালে এটি উদ্বোধন করা হয় এবং ২০০৪ সালেই আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ এর কিছু খেলা এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এই স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা ২০ হাজার। ২০০৬ সালে এখানে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম: দেশের অষ্টম আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ম এটি। ২২,০০০ দর্শক ধারণের ক্ষমতা সম্পুন্ন এই স্টেডিয়ামটি ২০০৭ সালে নির্মিত হয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেট আয়োজন:

ক্রিকেট খেলার সাথে সাথে সব ধরণের ক্রিকেট প্রতিয়োগিতার সফল দেশও বাংলাদেশ। সফল আয়োজক হিসেবে বিশ্ব মিডিয়ায় বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে এ দেশের অতিথিয়তা। প্রথমবারের মতো ১৯৮৮ সালে এশিয়া কাপ আয়োজন করে বাংলাদেশ। বাংলার মাটিতে সে সময়ে এটি সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট। এরপর ১৯৯৮ সালে টেস্টভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে বসে নক আউট পর্বের আইসিসি বিশ্বকাপ। টেস্ট স্ট্র্যটাস না থাকায় সেবার বাংলাদেশ অংশ নিতে পারেনি। একই বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানকে নিয়ে আয়োজন করা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ। পরের বছর এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করে বাংলাদেশ এবং ২০০০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের আয়োজক বাংলাদেশ।

চার বছর পর ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের একক আয়োজক বাংলাদেশ। ২০১১ সালে ভারত, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়ানডে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করে বেশ প্রশংসা কুড়ায় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচ বাংলাদেশে আয়োজন করে বিশ্বে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের নাম প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১২ সালে তৃতীয়বারের মতো এবং ২০১৪ সালে চতুর্থবারের মতো এশিয়া কাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ। বাকি ছিল শুধু টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ। সেটাও এবার পূর্ণ হয় ২০১৪ সালে। পুরুষ ও মহিলাদের মিলিয়ে ২৬ দলকে নিয়ে ক্রিকেটের এত বড় আসর এর আগে কোন দেশ করেনি। যেটা করে দেখাল বাংলাদেশ। তিনটি ভেন্যুতে এই বিশ্বকাপ আয়োজন হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। ২২ দিনের মহাযজ্ঞের আসর সাফল্যের সাথে শেষ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায় বাংলাদেশ আতিথিয়তা ব্যবস্থাপনার।

এই খানে শেষ নয় ২০০৪ সালের পর আবারো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আয়োজকের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুবাদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচগুলো হবে বাংলাদেশেই।

টাইগারদের আয়

জাতীয় সংসদে দেয়া যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের তথ্যমতে, ক্রিকেটারদের বছরে আয় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন খেলোয়াড়ের মাসিক বেতন, আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ম্যাচ ফি অনুযায়ী এই টাকা বিসিবির মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। তিনি জানান, বর্তমানে বিসিবির ১৪ জন চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় রয়েছেন। তাদের মাসিক বেতন ‘এ+’ গ্রেডে ২ লাখ টাকা। এই ক্যাটাগরিতে রয়েছেন ৪ জন। ‘এ’ গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৭০ হাজার। এই ক্যাটাগরিতে রয়েছেন ১ জন। ‘বি’ গ্রেডের বেতন ১ লাখ ২০ হাজার, পান ৩ জন। ‘সি’ গ্রেডের বেতন ৯০ হাজার, পান ৩ জন। এছাড়া ‘ডি’ গ্রেডে ৩ জন পান ৬০ হাজার টাকা করে। মন্ত্রী আরো জানান, আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ বাবদ জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বোর্ড থেকে ম্যাচ ফি প্রদান করা হয়। এই ম্যাচ ফির হার টেস্ট ম্যাচে ২ লাখ, একদিনের ম্যাচে ১ লাখ এবং টি২০ ম্যাচে ৭৫ হাজার টাকা। এছাড়া বোর্ডের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত প্রথম শ্রেণির (লংগার ভার্সন) জাতীয় লীগে অংশগ্রহণ বাবদ প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ম্যাচ প্রতি ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা ম্যাচ ফি প্রদান করা হয়। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বিদেশি কোচদের বেতন ভাতাদি বাবদ মাসিক আনুমানিক ৭০ লাখ টাকা খরচ করা হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া বিভিন্ন ক্রিকেট সিরিজ ও টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে গত আর্থিক বছরে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

গেল বছরের অক্টোবরে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত খবরে জানা যায়। ক্রিকেটারদের ‘অঘোষিত’ আয়ের মূল উৎস ঘরোয়া লিগ, যার নাম ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। ক্লাব কাকে কত দেয় সেটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ এর পুরোটাই ‘আনডিক্লেয়ার্ড মানি’। কথিত আছে সর্বশেষ মৌসুমে প্রাইম দোলেশ্বরে মুশফিক খেলছেন ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে, যদিও এ খবর অস্বীকার করেছেন তিনি। এর পুরোটাই আয়করের আওতাবহির্ভূত। যুগ যুগ ধরে ক্লাব ক্রিকেট থেকে আয়ের বিপরীতে আয়কর দেন না ক্রিকেটার, কোচদের কেউই। কারণ ওই একটাই, পুরোটাই অঘোষিত লেনদেন। মুশফিক তিনটি পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে ঠিক কত আয় করেছেন, সেটিও অপ্রকাশিত। প্রচলিত আছে, বিজ্ঞাপণের রাজ্যে মুশফিকের বর্তমান বাজার দর ৩০ লাখ টাকার মতো। কিন্তু চুক্তিতে কী আছে, সেটি গোপনই রাখে উভয় পক্ষ। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবার চেয়ে ধনী সাকিব আল হাসান। আইপিএল থেকেই এক মৌসুমে তিনি পেয়েছেন চার লাখ ২০ হাজার ডলার। অস্ট্রেলিয়ার ‘বিগ ব্যাশ’ লিগ খেলে ৫০ হাজার ডলার। এরও বছর দুয়েক আগে ইংলিশ কাউন্টি খেলেও অর্থ উপার্জন করেছেন সাকিব। তবে এসব খাত থেকে উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আয়কর সাকিবকে দিতে হয়েছে।

শীর্ষ তারকা হওয়ার সুবাদে বিজ্ঞাপনের বাজারেও সাকিব সবচেয়ে দামি। বিস্কুট, আইসক্রিম, অ্যান্টিভাইরাস, ব্যাংক, মোটর বাই এবং মোবাইল ফোন অপরেটর কোম্পানির পণ্যদূত হওয়ায় সাকিবের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাংলাদেশি তারকাদের বিচারে অভাবনীয়। গুঞ্জন আছে, দুই বছরের জন্য সাকিবকে বাংলালিংক দূত করেছে দুই কোটি টাকার বিনিময়ে! এ ছাড়া ৪০ লাখের নিচে দূতিয়ালি করেন না সাকিব। সর্বশেষ ঢাকা লিগে গাজী ট্যাংকস ক্রিকেটার্স তাঁকে ৫০ লাখেরও বেশি দিচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। গত বেশ কয়েক মৌসুম ধরেই সাকিব ঢাকা লিগের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত খেলোয়াড়। যদিও অঙ্কটা বরাবরই অজানা থাকে, কারণ সেই অঘোষিত অর্থ! শোনা যায়, সাকিবের মোট সঞ্চয় শোনা যায় ৩০ কোটি টাকা।

আইপিএল, বিগ ব্যাশ বাদ দিলে তামিম ইকবালের ক্রিকেট থেকে উপার্জন সাকিবের প্রায় সমান। কারণ এ দেশের বিজ্ঞাপনের বাজারে সাকিবের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তামিম। জানা যায়, শেয়ারবাজারের ব্রোকার হাউসেও অংশীদারি রয়েছে তাঁর। ঢাকা লিগেরও দামি ক্রিকেটার তিনি।

বর্তমানে টাইগার অধিপতি মাশরাফি বিন মর্তুজার উপার্জন অপেক্ষাকৃত কম। এক মৌসুম আইপিএল খেললেও ইনজুরির কারণে অনেক দিন ধরেই টেস্ট খেলছেন না তিনি। তাই বেতন শীর্ষ তারকাদের সমানুপাতে পেলেও ম্যাচ ফি থেকে খুব বেশি আয় নেই মাশরাফির। ঘরোয়া ক্রিকেটে শীর্ষ পারিশ্রমিকপ্রাপ্তদের কাছাকাছিই আয় করেন তিনি। ক্রিকেটের বাইরেও উপার্জন আছে মাশরাফির। জানা যায়, ছোটখাটো একটা চিংড়ির ঘের রয়েছে তাঁর।

শোনা যায়, নাসির হোসেনের আয় বছরে দুই কোটির বেশি বলে। মাহমুদুল্লাহ, আবদুর রাজ্জাকের উপার্জনও নাসিরের চেয়ে কম নয় বলে জানা যায়। এমনকি জাতীয় দলে এখনো খেলার সুযোগ পাননি, এমন অনেক তরুণেরই এখন বার্ষিক আয় কোটি টাকার ওপরে, বিশেষ করে যারা বাংলাদেশ ‘এ’ দলে নিয়মিত।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.