পাদুকা শিল্প

পাদুকা শিল্প

 

পাদুকা শিল্পে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে আধুনিক পাদুকা শিল্পের সূচনা ১৯৮০-র দশকে ঘটলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেই এ অঞ্চলে পাদুকা শিল্পের প্রসার ঘটেছিল। আর ১৯৯০-এর দশকে এসে বাংলাদেশ পাদুকা সামগ্রী রপ্তানি শুরু করে। ব্রিটিশ আমলে এ দেশে পাদুকা নির্মাণ কুটির পর্যায়ের ছিল। ১৯৪৭-এর পূর্ব পর্যন্ত কলকাতাই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের ব্যবহারের পাদুকা সামগ্রী আমদানির প্রধান উৎস। ১৯৪৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাদুকা আমদানি শুরু হয়। বাটা সু কোম্পানি টঙ্গীতে জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে ১৯৬২ সালে এবং এটিই ছিল এ দেশ বৃহদায়তন পাদুকা উৎপাদনের প্রথম শিল্প প্রতিষ্ঠান। এরপর ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্টার্ন প্রোগ্রেসিভ সু ইন্ডাস্ট্রিজ। দুটি প্রতিষ্ঠান একত্রে যা উৎপাদন করত তা স্থানীয় বাজারে যেমন প্রচুর পরিমাণে যোগান বৃদ্ধি করে তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোস্লোভাকিয়া ও ইংল্যান্ডসহ বহু দেশে রপ্তানিও করে। স্বাধীনতার পর পাদুকা শিল্পে বাংলাদেশ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে – নতুন নতুন অনেক পাদুকা কারখানাও গড়ে ওঠে। লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১০টি রপ্তানিমুখী কারখানায় চামড়ার পাদুকা তৈরি হয়। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম বেঙ্গল এবং বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি।
 
বর্তমান হালচাল
বাংলাদেশে জুতার চাহিদা কত- তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। তবে বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে এ খাতের ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি (২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন) পাদুকার চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয়। দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি মিলিয়ে এখন বাংলাদেশের জুতার বাজারের আকার প্রায় ৫০ কোটি ডলারের। আর দেশের পাদুকা শিল্প এখন সম্প্রসারিত হওয়ার জন্য অনেক বেশি তৈরি। বর্তমানে বাংলাদেশে দুই হাজারেরও বেশি পাদুকা শিল্পকারখানা রয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ২৩টি মোটামুটি বৃহদায়তন এবং যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন পরিচালনা করে। অন্যগুলিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের পাদুকা শিল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৩ কোটি ২০ লক্ষ জোড়া। তবে এই সংখ্যা চামড়া, প্লাস্টিক, রাবার সব উপাদান দিয়ে তৈরি পাদুকার সর্বমোট হিসাব। মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২ কোটি ৫০ লক্ষ জোড়া উৎপাদনের ব্যবস্থা আছে যান্ত্রিক প্রযুক্তিমূলক কারখানায়, বাকিটা তৈরি হয় হস্তশিল্প কারিগরদের নিয়ে গড়া ছোটখাটো কুটির শিল্প জাতীয় ঘরগুলিতে। পাদুকা খাতের বড় ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলি দৈনিক ৭৫০ থেকে ৩,০০০ জোড়া জুতা উৎপাদন করে। আর উৎপাদনের বৃহদাংশই যায় স্থানীয় বাজারে, যদিও একটি অংশ রপ্তানিও হয়। পাদুকা শিল্পে প্রায় ২৫,০০০ লোকের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে, যদিও এর কাঁচামালের যোগান, বিজ্ঞাপন ও বিপণন নেটওয়ার্ক বিবেচনায় আনলে এ শিল্পে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দাঁড়াবে এর কয়েকগুণ। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প জাতীয় কারখানাগুলিতে যারা কাজ করে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মহিলা। দেশের সব পাদুকা কারখানার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি অবস্থিত ঢাকা ও চট্টগ্রামে। দেশের বাজারে পাদুকা সামগ্রী বিপণনে নিয়োজিত পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ে আনুমানিক ৫০,০০০ লোক কাজ করে।
রপ্তানি আয়
বাংলাদেশ এক সময় প্রচুর পরিমাণে পাদুকা আমদানি করলেও এখন পাদুকা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং প্রচুর পাদুকা বিদেশে রপ্তানি হয়। ১৯৭২ সালেও বাংলাদেশ ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার পাদুকা রপ্তানি করেছে। তবে ১৯৯৭ সালে রপ্তানিকৃত পাদুকার মূল্য ছিল ১৯০ কোটি টাকা। রপ্তানি ক্ষেত্রে প্রকৃত অগ্রগতি ঘটেছে ১৯৯০-এর পর এবং ১৯৯০-৯১-এর তুলনায় ১৯৯৬-৯৭তে রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৫২৭%। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)’ র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও চামড়ার জুতা বিদেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১২৯ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ।চামড়া শিল্পের রপ্তানি আয়ের মধ্যে গত অর্থবছর জুতা রপ্তানি থেকে এসেছে ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছর পাদুকা রপ্তানি করে ৪১ দশমিক ৯৩ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৪৪ কোটি ৩,৯ লক্ষ মার্কিন ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি; ফুটওয়্যার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। বিশ্বে পাদুকা বাজারে বাংলাদেশ তুলনামূলক নতুন হলেও কাঁচা চামড়া রপ্তানি করে আসছে প্রায় চার দশক ধরে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কাঁচা চামড়া বা ওয়েট-ব্লু লেদার এবং প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া ক্রাস্ট লেদার রপ্তানি হতো বেশি। আর এখন বেশি রপ্তানি হয় ফিনিশড লেদার। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, দেশে প্রতিবছর গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন বর্গফুট ফিনিশড লেদার উৎপাদন হয়, যার বেশির ভাগটাই রপ্তানি হয়। ২০১৪ সালে যেখানে ২৮০ মিলিয়ন বর্গফুট ফিনিশড লেদার উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে রপ্তানি হয়েছে ২৬০ মিলিয়ন বর্গফুট।
রপ্তানি গন্তব্য
বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জাপান; মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ জাপানের বাজারেই যায়। আর বাংলাদেশের চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জাপান ‘ডিউটি ফ্রি’ ও ‘কোটা ফ্রি’ সুবিধা দিয়ে আসছে।বাংলাদেশ থেকে এখন যেসব দেশে পাদুকা রপ্তানি হয় সেগুলি হল: সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বেলজিয়াম, সেন্ট, বলিভিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, চিলি, চীন, কলম্বিয়া, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি, ডেনমার্ক, আলজেরিয়া, ইকুয়েডর, বহুজাতিক রাষ্ট্র, এস্তোনিয়া, স্পেন, ফিনল্যান্ড, ফিজি, ফ্রান্স, গ্রীস, হংকং, ক্রোয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আয়ারল্যান্ড, ভারত, ইরাক, আইসল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কোরিয়া, কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, লাটভিয়া, মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া, মালদ্বীপ, মেক্সিকো , মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, ওমান, পানামা, পেরু, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, প্যারাগুয়ে, কাতার, রোমানিয়া, সার্বিয়া, রাশিয়ান ফেডারেশন, সৌদি আরব, সুইডেন, সিঙ্গাপুর, স্লোভেনিয়া, স্লোভাকিয়া, সেনেগাল, এল সালভাদর , সোয়াজিল্যান্ড, থাইল্যান্ড, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উরুগুয়ে, ভেনিজুয়েলা, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া
সম্ভাবনা 
ফরাসিদের ‘ফ্রেঞ্চ কাফের’ পর মানের দিক থেকে আমাদের দেশের চামড়াই দুনিয়ার সেরা। এরকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া অন্য কোথাও মেলে না।
চীনের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের ফলে তৈরি পোশাক খাতের পর এবার চামড়া শিল্পে নতুন আশার হাতছানি দেখতে পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কারণ, বিশ্বের সবচে বেশি পাদুকা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এ খাত থেকে নজর সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশই হতে চলেছে চামড়া শিল্পের বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য। শুধু চীন নয় চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ ভিয়তেনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ৫০ কোটি ডলারের জুতাশিল্পকে পাঁচ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বেশকিছু সরকারি উদ্যোগের ফলে বিদেশি উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে  বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলছে বলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, হাইতি ও বাহামা দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী এরই মধ্যে অন্তত ৫১টি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশের পাদুকা শিল্পে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। শুরুর বিবেচনায় এক দিক দিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প পোশাক খাতের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। গার্মেন্ট শিল্পের ক্ষেত্রে শুরুতে বিদেশি অর্ডার থাকলেও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ছিল না। পরে সেটা ডেভেলপ করা হয়। আর চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, মানে কাঁচা চামড়া, সেই চামড়াকে প্রক্রিয়াকরণের কারখানা প্রচুর রয়েছে এখানে। অর্থাৎ চামড়ার জুতা তৈরির সকল ধরনের সুবিধাই প্রস্তুত।
এছাড়া রয়েছে সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তা। যেমন: আমাদের চামড়ার বিশাল একটি উৎস রয়েছে আছে। কিন্তু জুতা বানানোর যন্ত্রপাতি যেমন কাটিং, স্যুয়িং মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর এই আমদানিতে গত ৫ বছর ধরে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে সরকার। আবার পাদুকা রপ্তানির ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের বেশি রপ্তানিতে সরকার ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি আছে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা।
বিভিন্ন সুবিধার কারণে আমাদের এ বাজার বিদেশিদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় খাত। আর এতো সস্তায় বিদ্যুৎ পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায় না, সেটাও একটা বড় দিক। সব মিলিয়ে বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ উপযোগী স্থিতিশীল পরিস্থিতি দিতে পারলে এবং নিজেরা আরো বেশি করে রপ্তানিতে যেতে পারলে পাঁচ বছরেই এ বাজার বেড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারের হতে পারে।
এরমধ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানাগুলো সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর হয়ে গেলে চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা আরও জোরালো হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.