অনলাইন শপিং

অনলাইন শপিং
এখন আর ভিড় ঠেলে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসে আরামে বাজার করা যায়। বাজার করার ধারণ এখন পাল্টে গেছে অনলাইন শপিংয়ের জন্য।

অনলাইন বাজারটা কত বড়?
তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে ‘অনলাইন শপিং’ ওয়েব সাইটগুলো এমন এক প্লাটফর্ম যেখানে একই ব্যক্তি পণ্য বা সেবা কেনা ও বেচা- দুই ধরনের সুবিধাই ভোগ করতে পারেন। তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফরেস্টার রিসার্চ ইনকরপোরেশন তাদের ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক অনলাইন রিটেইল ফোরকাস্ট ২০১৩ টু ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৩ সালে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের সম্মিলিত বাজার ছিল ৬৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ ছয় দেশের সম্মিলিত বাজার ছিল প্রায় ৩৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০১৮ সালে দাঁড়াবে ৮৫৮ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্বজুড়ে অনলাইনে কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ছেই। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস (আইবিএম) এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৩ সালের শেষের তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এ খাতে কেনাকাটার পরিমাণ ২০১২ সালের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। মার্কিন ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৩ সালে অনলাইন কেনাকাটায় চীনের সাধারণ ক্রেতারা কেনাকাটা করেছে ২১ হাজার ২৪০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য বা সেবা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ব্যয়ের পরিমাণ ২২ হাজার ৮৭০ কোটি মার্কিন ডলার। মার্কিন বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ই-মার্কেট-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো ই-কমার্সে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ভোক্তারা উত্তর আমেরিকার ভোক্তাদের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। এ বছর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ভোক্তারা ৫২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করছে। আর উত্তর আমেরিকানরা ব্যয় করেছে ৪৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্যের দ্য অফিস অব কমিউনিকেশনসের বরাতে জানা যায়, প্রতি এক সপ্তাহে গড়ে চারজন ব্রিটিশ নাগরিক অনলাইনে শপিং করেন।

বাংলাদেশর অনলাইন বাজার
২০০৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনলাইন লেনদেনকে বৈধতা দেয়া হয়। সেই সময় থেকেে এ দেশে ই-কমার্সের সূচনা হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মতে, ২০১৪ সালে দেশের জনসংখ্যার ৭২ দশমিক ৭৫ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী এবং মাত্র এক-পঞ্চমাংশ প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিডিওএসএন) তথ্য, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৪ সালের ৭০ লাখে পৌঁছেছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি অনলাইনে কেনাকাটাকে দিনকে দিন জনপ্রিয় করে তুলছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস)-এর তথ্যানুসারে, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্স ১৫০ শতাংশ বেশি বেড়েছে। ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ যখন নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল তখন ই-কমার্সে মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা; আর মোট ক্রেতার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লক্ষ। বাংলাদেশে বর্তমানে কেনাকাটার জনপ্রিয় সাইটের মধ্যে রয়েছে, বিক্রয় ডটকম, এখানেই ডটকম, আজকের ডিল ডটকম, চালডাল ডটকম, দারাজ ডটকম ডটবিডি, এখনি ডটকম, ক্লিক বিডি ডটকম, বিপণি ডটকম, উপহারবিডি ডটকম, বিডিহাট ডটকম, সামগ্রিক ডটকম, হাটবাজার ডটকম, ইজি-বাজার ডটকম, ইউশপ ডটকম, একমাত্র ডটকম এবং কেনাকাটা ডটকম। বিশেষায়িত অনলাইন মার্কেটপ্লেসের মধ্যে উল্লেখযোগ হল: জমি ও বাড়ি কেনাবেচার জন্য ই-কমার্স সাইট জার্মানির লামুডি, বিভিন্ন ধরনের যানবাহন বেচাকেনার জন্য জার্মানির কারমুডি। এই সব ওয়েব সাইট থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই কেনাকাটা করা যায় জামা, জুতা, শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, গয়না, ল্যাপটপ, মোবাইল, কম্পিউটার, গাড়ি, জমিসহ নিত্যনতুন সামগ্রী। রয়ছে নিজের পুরনো জিনিসপত্র বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন ও বিক্রয়ের সুবিধা। গত বছর ওএলএক্স এবং মার্কেট রিসার্চ ফার্ম ম্যাট্রিক্সল্যাবের প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ১ কোটি ৫ লক্ষ ব্যবহৃত দ্রব্যাদি তালিকাভুক্ত করেছেন। গবেষণাটি থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা মোট যে পরিমাণ ব্যবহৃত দ্রব্যাদির শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, তার অর্থমূল্য ১৪৭ বিলিয়ন টাকা। ওএলএক্স বাংলাদেশে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে কার্যক্রম শুরু করে। মাত্র আট মাসে দুই লাখ ২৫ হাজারের বেশি শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন পায় সাইটটি। গত জানুয়ারি মাসে ওএলএক্স একীভূত হয় এখানেই ডটকমের সাথে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস বিক্রয় ডটকম যাত্রা শুরুর দুই বছরের মধ্যে ৩২ লাখেরও বেশি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে।

অনলাইন সপের আয়ের উৎস
এসব অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর আয়ের অন্যতম বড় দুইটা উৎস হল: (১) কস্ট পার লিংক (সিপিসি) বা পে পার লিংক (পিপিসি) এবং (২) কস্ট পার ভিউ (সিপিভি)। একটি ওয়েবসাইটের কোনো পৃষ্ঠায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির লিংকের মধ্যে কোনগুলোতে বেশি ক্লিক পড়েছে, তা জানা যায় সিপিসি বা ক্লিক রেটের মাধ্যমে। আর বিজ্ঞাপনে ক্লিকগুলো দেখিয়ে সাইটের মালিকরা তাদের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনগুলো দেখাতে পারেন এবং তা থেকে সিপিভি-এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারেন। এসব ওয়েবসাইটে একজন বিজ্ঞাপনদাতা তাদের বিজ্ঞাপন দেন গুগল অ্যাডসেন্স থেকে গুগল অ্যাডওয়ার্ডসে গিয়ে। আর এই ওয়েবসাইটগুলো আয় করে গুগল থেকে।

ভোগান্তি
অনলাইন শপিংয়ের অনেক অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। আর তাই প্রতিনিয়ত ক্রেতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হচ্ছেন প্রতারিত। ছবিতে পণ্যের যে লুক দেখা যায় বাস্তবে তার মিল থাকে না। এ ক্ষেত্রে পণ্য না নিতে চাইলে ডেলিভারি চার্জ দিতে হয়। আবার দাম নিয়ে রয়েছে অনেক বিভ্রান্তি। অনেক সময় বাজার মূল্য থেকে বেশি দাম পড়ে যায় অনলাইন শপের পণ্যেও দাম। আবার যে সময় সাশ্রয়ের জন্য অনলাইন থেকে পণ্য কেনা হয় সেই সময়টাও নষ্ট হয় পণ্য কখন ডেলিভারি দিয়ে যাবে তার অপেক্ষয় থেকে। এছাড়া রয়েছে কেনাকাটায় উচ্চ হার। অনলাইনে কেনাবেচা-সংক্রান্ত লেনদেনের মাধ্যম ব্যাংক। আর এ বাবদ ব্যাংক প্রতি লেনদেনে ফি কেটে নিচ্ছে ৪ শতাংশ হারে। অথচ ব্রিটেনে প্রতি ২৭টি লেনদেন বাবদ ব্যাংকগুলো ফি রাখে ৫ পাউন্ড।

অনলাইনগত বৈধতা
দেশের অনলাইন শপিংয়ের ওয়েব সাইট বাড়লেও এখন পর্যন্ত তা সুসংগঠিত নয়। নেই অনলাইনে কেনাবেচার কোনো নীতিমালা। গতানুগতিক ব্যবসার মত অনলাইন সপ শুরু করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। এরপর ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন করে, ওয়েবসাইট তৈরি করে নিয়ে, প্রয়োজন অনুযায়ী হোস্টিং নিয়ে সাইট চালু করতে হয়। অনেকেই এখন ঘরে বসেই সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব অনলাইন সপের বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। এজন্য ফেসবুক, টুইটার খুললেই একটার পর একটা বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এতে নিয়মিতই বিভিন্ন পণ্যের বিবরণ ও মান সম্পর্কে সব ধরনের খবর দেওয়া হয়। অনেকে আবার কোন ওয়েব সাইট তৈরি করে নয়, ফেসবুকের ফ্যান পেজের মাধ্যমে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। এভাবে বিক্রীত পণ্যের উপর ভ্যাট দিতে হয় না। কারণ, বাংলাদেশের অনলাইন স্টোরগুলোতে মূলত নিজস্ব পণ্য থাকে না। তাই এ ক্ষেত্রে ভ্যাটের বিষয়টাও খাটে না। যারা দেশের বাইরে থেকে পণ্যের অর্ডার নেন তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ১৮/এ ধারার অনুমোদন নিতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ১৮ এ এবং বি ধারায় স্থানীয় এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠানের কমিশন, ফি, সার্ভিস চার্জসহ যাবতীয় তথ্য এবং অফিস খরচ হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগে দাখিল করতে হয়। অন্যদিকে অন্যান্য দেশে পণ্য বিক্রির সুযোগ পেতে হলেও বিক্রেতাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুষঙ্গিক তথ্য দাখিল করতে হয়। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের পরই কেবল একজন বিক্রেতাকে পণ্য বিক্রির জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যে কেউ ইচ্ছে করলেই অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন দিতে পারেন।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.